হে পঙ্খী রুখে দাড়া - আশুতোষ দেবনাথ



এক ভাদ্রের সকালে । আকাশে লাজুক-পানা ভাদ্র-বউয়ের মতো রোদ্দুর উঁকি দিচ্ছিল ভেসে যাওয়া মেঘের ফাঁকেফাঁকে । নোয়াইয়ের পাড়ে । ব্রিজের ধারে । চৌরাস্তার মোড়ে । বাস স্ট্যান্ডের একপাশে পরপর ভ্যানগুলো দাঁড়িয়ে ছিলো । পচা ভাদ্রের খেয়ালি বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া তিন চাকার ভ্যানগুলোর উদলা কাঠের পাটাতনের রস টানছিল এখন রোদ ওঠায়
সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যানের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে ভ্যানওয়ালারা । তাঁদের কারো গায়ে গেঞ্জি । কারো গায়ে জামা লুঙ্গি প্যান্ট ধুতি পাজামা যে যার সুবিধে মতো পরেছে । মাজায় গামছা বাধা ।
ভ্যাপসা গুমোট গরমে ফুলো ফুলো গায়ে ঘামাচি আর ঘেমো গন্ধ । মাথায় ঝাঁপানো চুল । মুখে খোঁচা খোঁচা গোঁফ দাড়ি । ডেলা পাকানো চোখে সদা সতর্ক-দৃষ্টি । প্যাসেঞ্জার খুঁজে নেবার ।
এইসব সারিসারি ভ্যানগুলোর চালকরা যখন তাঁদের আকাঙ্ক্ষিত প্যাসেঞ্জারের জন্যে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল তখন একটু দূরে তেঁতুল গাছের আড়ালে পঙ্খী তার কালু মামার ভ্যান দাড় করিয়ে সীটের উপর গোত্তা মেরে বসে পথ চলা মানুষ জনের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখে দু-একজন ছুট-ছাট প্যাসেঞ্জার তুলে নেবার ।
ভাদ্রের নোয়াই এখন পরিপূর্ণ । যেন টইটম্বুর যৌবনবতী নটী । নোয়াইয়ের দুই পাড়ে সবুজ গাছপালা এখনও কিছু অবশিষ্ট আছে । ব্রিজের নিচ থেকে নাবালে সারিসারি টালির ঝুপড়ি ঘর । স্বাধীনতা ও দেশভাগের পর পঁচিশটা বছরের ঘা (ক্ষত) শুকোতে না শুকোতেই আবার একাত্তরের বাংলা দ্যাশ স্বাধীন হওনের জ্বালা যেন গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো চেপে বসেছে । তাঁদের রক্ত ঘাম মল মূত্র দ্বারা দুষিত হয়ে কোনও এক সময়ের লাবণ্যবতী নদী এখন নোয়াই খাল হয়ে বিদ্যাধরীর সঙ্গে মিলিত হবার জন্যে বয়ে চলেছে ।
ভ্যানের সীটে বসে পঙ্খীর চোখ দুটিও কেমন ভাবুক আর উদাসীন হয়ে যায় । কি যেন হারিয়ে গেছে পঙ্খীর । স্বপ্ন সাধ ভালোবাসা আর মায়া মমতা । আপনজন বলতে তার তো এখন আর কেউ নেই । আগে যা হোক মাথার উপর দিদিমা ছিল । তার স্নেহময়ি দিদিমা মারা যাবার পর সে এখন দিশাহীন ভাসন্ত এক শ্যাওলার মতো । আজ এখনে তো কাল সেখানে ।
যতসব উটকো ঝামেলা । এখানে এইভাবে তেঁতুল গাছের আড়ালে ভ্যান নিয়ে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে ওরা দল বেঁধে ধেয়ে আসবে । প্যাসেঞ্জার তুলতে দেখলে তো আর রক্ষে থাকবে না । প্যাসেঞ্জার নামিয়ে নেবে । চাকার হাওয়া খুলে দেবে । চড় থাপ্পড় মেরে কান ধরে ওঠ বস করাবে । তারপর ভ্যান নিয়ে যাবে । আটকে রাখবে। একশো টাঁকা জরিমানা দিতে হবে । এমনি জুলুম বাজি ।
তাই এইসব ঝুট ঝামেলা ভালো লাগে না পঙ্খীর । কেনই বা লাগবে । এবার তো তার রেল ময়দানে রাসের মেলায় শ্রী দাম সখা পালায় কৃষ্ণ সাজবার কথা । তাই ভোর থাকতে উঠে বাঁশিতে সুর তুলতে বসেছিল পঙ্খী ।
নোয়াই –এর কুল ভেসে যাওয়া পাড়ে । নধর সবুজ রাধাচূড়া গাছের তলায় মাচায় বাসে ওস্তাদের কাছে শেখা সুর তুল ছিল পঙ্খী বাঁশিতে । পঙ্খীর ওস্তাদ বংশী কীর্তনিয়া । শ্রীদাম সখা পালার হেড ।
বাঁশি বাজাতে বাজাতে সুর তাল আর লয়ের খেলায় এক মায়াময় জগতে চলে গিয়েছিলো পঙ্খী । বাঁশির সেই সুমধুর সুর খাল পার হয়ে ওপারের ইটভাটায় মিলিয়ে যাচ্ছিলো । আর পঙ্খীর মনে হচ্ছিল সে নিজেই যেন বৃন্দাবনে গোপিনীদের মধ্যে বিরাজ করছে ।
তখন ফুলি গিয়ে পঙ্খিকে বলেছিল, ভাগ্না এইভাবে বাঁশীতে মজে থাকলে হবে ? ঘরে তো চাল আটা তেল নুন কয়লা ঘুটে কিছুই নেই । এই ভাবে বাঁশি বাজালে পেট ভরবে ? তোমার মামাতো মাজায় ব্যথায় উঠতেই পারছে না । তুমি যাও না তোমার মামার ভ্যান নিয়ে । দ্যাখো না গিয়ে । আউটে কিছু হয় নাকি । কাল থেকে তো আধপেটা খেয়ে আছ ।
আমি পারবো না । লাইন নেই । ভ্যান নিয়ে রাস্তায় বার হলি সবাই তেড়ে আসে । গালাগাল দেয় অজাত কুজাত বলে । প্যাসেঞ্জার তুললে চাকার হাওয়া খুলে দেয় । জরিমানা করে । কিল চড় ঘুসি খেতে হয় । তারপর চুল টানা, নাক টানা, কান টানা, । ওরা সবাই মিলে যা খুশি করে । বলতে বলতে পঙ্খীর মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিলো তার সুর সাধনায় বিঘ্ন ঘটায় ।
পঙ্খীর কথায় ফুলি থম মেরে গিয়েছিলো । আহত অভিমানে গুমরে ওঠা মন কষ্টে ফুলি বলেছিল, তুমি যেতে না পারলে থাক । তা হলে আমিই যাচ্ছি রঙ মিস্ত্রিদের সাথে যোগাড়ের কাজে ।
তুমি যাবে এই অবস্থায় । ফুলির কথায় পঙ্খী অবাক হয়ে গিয়েছিল । পঁচিশ পেরিয়ে ছাব্বিশের ফুলি এখন ভরা-মাস পোয়াতি । এই অবস্থায় কেউ আবার পারে নাকি ভারায় উঠে হেল্পারের কাজ করতে ।
পঙ্খীর কথায় ফুলি বলেছিল, তুমি যখন পারবে না বলছ তখন আর কি করা যাবে বলো । আমার ভাগ্য টাই তো খারাপ ।
তোমার মামার এই রকম অ্যাকসিডেন্ট হয় । তবু মন্দের ভালো এই যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেছে মানুষটা । এখন সেরে উঠতে কতদিন সময় লাগবে কি জানি । আর সেরে ওঠার পর ভ্যান চালাতে পারবে কিনা তারও ঠিক নেই । তখন তো তাকে আমার কাজ করে খাওয়াতে হবে । তুমিই বা আর কতো দিন । আজ আছ তো কাল নেই । বিয়ে থা করো নি । আজ যাত্রার দলে তো কাল কীর্তনের দলে । আমি তো আর সারা জীবন তোমার ভরসায় থাকব না । এই বিপদের সময় তুমি ছিলে তাই রক্ষে । বলতে বলতে ফুলির গলা ধরে এসেছিলো । তারপর পেটে বাচ্চা নিয়ে এখন আমি কতদিক সামলাব বলো ? ঠিকেদার কালাদা তো বলেছিল কি যেন বলতে গিয়েও শেষে বলে না ফুলি ।
সে কথা ফুলি না বললেও পঙ্খী জানে । জানে যে, ঠিকেদার কালাচাঁদ ফুলিকে বলেছিল বাচ্চা নষ্ট করে ফেলতে । ফুলি রাজি হয়নি । বদমাশটার খারাপ মতলব বুঝতে পেরে । আর এখন তার হ্যাপা পঙ্খীকে পোহাতে হবে । এই ফুলি মামির বাচ্চা না হওয়া পর্যন্ত ।
তবে আউটে ভ্যান চালানোর লাইনে নতুন নয় পঙ্খী । আগেও সে ভাড়া করা ভ্যান চালিয়েছে আউটে । তাই পঙ্খী জানে কি ভাবে কোথা দিয়ে প্যাসেঞ্জার তুলতে হয় ।
এখন সকাল নটার পর চৌরাস্তার মোড়ে শুরু হয়েছে মানুষ জনের বিচিত্র কোলাহল । ওদিকে সিনেমা হল পেরিয়ে রেল ইষ্টিশন । ইষ্টিশনের কাছেই বাজার স্কুল দোকান পসার । ব্যাঙ্ক পোস্ট অফিস কলেজ । এ দিকে চৌরাস্তা পেরিয়ে সাজিরহাট বাস স্ট্যান্ড । কর্ম ব্যস্ততায় মানুষ জনের ছুটাছুটিতে এখন মুখর হয়ে উঠেছে নোয়াই পাড়ের চৌ রাস্তা । ভ্যানওয়লা সীটে বসে হাঁকছে। ইষ্টিশন । ইষ্টিশান একজন । ইষ্টিশান একজন । দু একজন প্যাসেঞ্জার হলেই কেউ কেউ চলে যাচ্ছে । আবার কেউ কেউ চারজনের জন্যে দাঁড়িয়ে থাকছে ।
সেদিকে তাকিয়ে পঙ্খী দাঁত বের করে হেসে ফেলল । দুহাত উপরে তুলে টানটান করে শরীরের আলিস্যি ভাঙে ।
আর পঙ্খীকে ওখানে ঐভাবে তেঁতুল গাছের গুড়ির আড়ালে ভ্যান নিয়ে শিকারির মতো ওত পেতে থাকতে দেখে ব্রিজের ভ্যানওয়ালা সমিতির নেত্যকাকা, জগা, হারু, কালাবদন পঙ্খীর দিকে তেড়ে গিয়ে বলে, এই পঙ্খী তোকে না বলেছি এখানে ভ্যান নিয়ে দাঁড়াবি না । ইস । আমাদের সামনে থেকে আগ বাড়িয়ে প্যাসেঞ্জার তুলবে । শালর স্পর্ধা কতো ।
কেন দাঁড়াব না কেন ? পঙ্খীও কম যায় না । বলে, রাস্তাটা কি তোমাদের বাপের জমিদারি নাকি ?
তবেরে হারামজাদা বেজন্মা তোকে দেখাচ্ছি মজা । গালাগালটা বেমালুম হজম করে প্যাডেল মেরে ভ্যান নিয়ে একটু দূরে সরে গিয়ে থুক থুক করে থুতু ছেটাল পঙ্খী । চোখের আগুন দৃষ্টিতে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকাল প্রতিপক্ষের দিকে । রাগটা পড়ে গিয়েও পড়ে না পড়ে না পঙ্খীর । ভাবে, আমার জন্মের যে ঠিক নেই সে কথা ওরা জানল কি করে ? আমার বাবার নাম নাকি যুধিষ্ঠির । আবার নাকি দুর্যোধনও । দূর । এক বাপের আবার দুটো নাম হয় নাকি ? হলেও হতে পারে । অনেকের তো দুটো নাম থাকে । এই যেমন তার দুটো নাম । পঙ্খীরাজ । কিন্তু সবাই তাকে ডাকে পঙ্খী বলে । কিন্তু একজনের যুধিষ্ঠির আবার দুর্যোধন নাম হয় কি করে । যুধিষ্ঠিরের সব থেকে বড় শত্রু তো দুর্যোধন।
সে কথা একদিন পঙ্খী তার দিদিমার কাছে জিজ্ঞাসা করায় দিদিমা বলেছিল, ধরে নে তোর দুটো বাপ ।
দুটো বাপ মানে । দূর তাই আবার হয় নাকি কখনো । তুমি কি যে বোলো না দিদিমা ।
কেন হবে না । একজন তোর জন্মদাতা বাপ । আরেকজন তোর পালিত বাপ ।
তার মানে ? তুমি কি বলতে চাইছ দিদিমা ?
কি বলতে চাইছি তুই মন দিয়ে শোন । জয়বাংলার মুক্তিযুদ্ধের সময় তোর মাকে ধরে নিয়ে গেছিল রাজাকার হারামিরা । ধরে নে গে ঐ খান সেনাগো ক্যাম্পে ভোগে দিচ্ছিল তোর মাকে । সেই নরক তোর জন্মের কারন । তারপর সেই মিলিটারি ক্যাম্প থেকে তোর মা পালিয়ে আসে । তারপর যুধিষ্ঠির তোর মাকে বিয়ে করে । বড় ভালো মানুষ ছিলরে তোর বাবা যুধিষ্ঠির । তোর মাকে সে বড় ভালোবাসতো । সে ছিল একজন মুক্তি যোদ্ধা । সেই যুধিষ্ঠির ইন্ডিয়ায় আসবার সময় তার বুড়ি মাকে বাঁচাতে গিয়ে খান সেনাগো মেশিনগানের গুলিতে মারা যায় । ঘর বাড়ি পোড়া আশ্রয় হীন আত্মীয় পরিজন হারা শোকে দুঃখে কাতর হাজারে হাজারে দলে দলে সহায় সম্বলহীন মানুষ বর্ডার পার হতে যাচ্ছিলো । তখন খান সেনাদের গাড়ি আসছে টের পেয়ে যে যার মতো দৌড়ে পালিয়েছিল । বনে জঙ্গলে ,পাট ক্ষেতে শটীবনে, বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে আবডালে । যে যেখানে পারে । সবাই চলে গেলেও তোর বাবা পারেনি তার বুড়ি মাকে ফেলে পালিয়ে আসতে । ভেবে ছিল বুড়ি মানুষ দেখে হয়তো রেহাই দেবে খান সেনারা । কিন্তু ওরা তখন ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো কাউকে রেহাই দেয় নি । নির্বিচারে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে মেরেছে যাকে সামনে পেয়েছে । তোর বাবাকেও । তোর ঠাকুরমাসহ আরও কয়েকশো মানুষকে মেশিন গানের গুলিতে ঝারা করে ফেলে রেখে চলে যায় । কিম্ভুত কিমাকার মানুষের লাশ দলা পাকিয়ে পড়েছিল । তাঁদের কোনও সৎকার হয়নি । শেয়াল শকুনে ছিড়ে ছিড়ে খেয়েছে । পঙ্খী তার বাবার এই মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা একধিকবার শুনেছে তার দিদিমার কাছে ।
আকাশে মেঘ ভেসে যাচ্ছে । কখনো হাল্কা পেঁজা তুলর মতো শাদা মেঘ । আবার কখনো ভারি মেঘ । কখনো রোদ উঠছে ঝকমকিয়ে । আবার কখনো ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টিও হচ্ছে । এই মেঘ বৃষ্টির লুকোচুরির খেলার মধ্যে পঙ্খীর মনে পড়ে তার স্নেহময়ি দিদিমার কথা । ভ্যান চালিয়ে যেতে যেতে ।
আজ আর দিদিমা বেঁচে নেই । দিদিমা বেঁচে থাকলে হয়তো পঙ্খীর এরকম উড়নচণ্ডী ভবঘুরে দশা হতো না । দিদিমা তাকে কোনদিন তার মা বাবার অভাব বুঝতে দেয়নি । দিদিমা পঙ্খীকে খুব ভালবাসত । এক বিশাল দেশ-ত্যাগি মানুষের সঙ্গে তার দিদিমাও ছিল তার মায়ের সঙ্গে । তারপর সীমানা পার হয়ে এসে তার জন্মের সময় তো বাংলাদেশ স্বাধীন হয় গেছে । আর তার মা তাকে জন্ম দিয়ে আবার চলে গেছে বাংলাদেশে তার বাবাকে খুঁজতে । কেন না দিদিমা তার মাকে বলতে পারেনি তার বাবার এই মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা । বললে মা বিশ্বাস করত না । বাংলাদেশে গিয়েও আর ফিরে আসে নি তার মা । এইভাবে পঙ্খীর জন্মদাত্রী মাও হারিয়ে গেছে ।
এতসব ভাবনার মধ্যে পঙ্খী ভ্যান চালিয়ে বাজার পেরিয়ে অনেক দূরে চলে এসেছে । রাস্তার দু পাশে ফলন্ত ধান ক্ষেত । দিগন্তব্যাপী নীল আকাশের ক্যানভাসে ছড়ানো ছিটানো হাল্কা সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে । সেই আকাশ দূরের সবুজ বন প্রান্তরে মিশে গেছে ।
রাস্তার পাশে ফাকা জমিতে ছোটো ছোটো প্লটে গড়ে উঠছে নতুন জনবসতি । সেই জনবসতির থেকে কয়েকজন মহিলা ও পুরুষ রাস্তায় উঠে এসেছে ইষ্টিশনে যাবার জন্যে । ওদের দেখে পঙ্খী বোঝে যে ওরা ইষ্টিশনে যাবার জন্যে একটা ভ্যান খুঁজছে । এইতো সুযোগ । পেয়ে গেছি । ধারে কাছে আর তো কোনও ভ্যান রিকশা বা অটো রিকশা নেই যে পঙ্খিকে বাঁধা দেবে । এই তো মওকা। পঙ্খী তারাতাড়ি তার ভ্যানখানা ঘুরিয়ে নিয়ে গেলো ওদের সামনে । গামছা দিয়ে পাটাতনের ধুলো ময়লা ঝেড়ে পঙ্খী বলে, আসুন দাদা-বউদিরা । ইসটিশনে যাবেন তো আপনারা ?
সব সকয় এখানে এভাবে ভ্যান পাওয়া যায় না । এখান থেকে অনেকটা হেঁটে গিয়ে বাজার পর্যন্ত যেতে হয় ইষ্টিশনে যাবার জন্যে রিকশা অটো ভ্যান যা হোক ধরার জন্যে । তাই পঙ্খীকে পেয়ে মেয়েরা খুশি হল, বলল, হ্যাঁ, আমরা ইষ্টিশনে যাব । এখান থেকে কতো ভাড়া নেবে গো ?
চার টাঁকা করে দেবেন ।
সবে বিয়ে হয়েছে এমন স্বামী স্ত্রী আর তাঁদের ভাই বোন সঙ্গে । হয়তো তারা দ্বিরাগমনে যাচ্ছে । পুরুষ যাত্রীটি বলল, কেন, চার টাঁকা নেবে কেন ? তিন টাঁকা করে তো ভাড়া ।
সে তো সাজিরহাট বাজার থেকে । এখান থকে অনেকটা হেঁটে গিয়ে । এতোটা রাস্তা এক টাঁকা বেশী তো হয় বলুন ।
জামাইবাবু পঙ্খীর কথায় গড়িমসি করতে চাইলে তার সঙ্গের শালীটি বলল, আর কতো হাঁটাবেন গো জামাইবাবু । আর তো হাঁটতে পারছি না । হেঁটে হেঁটে যে পায়ে যে ব্যথা হয়ে গেলো । শালির কথায় সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী বলল, তুমি চলো তো এই ভ্যানে । পেয়েছি যখন ।
নতুন বউদির কথায় তার ননদ বলে, দাদা আমি আর হাঁটতে পারছি না । তুমি এখান থেকে ভ্যান ধরো ।
শ্যালিকা বোন ও স্ত্রীর কথায় জামাইবাবু পঙ্খীর ভ্যানে চাপল । পঙ্খী এটাই চাইছিল ।
দুজন সামনে দুজন পিছনে একজন ভিতরে উঠে বসে । এই পাঁচ জনকে নিয়ে পঙ্খী ভ্যানের হ্যান্ডেল ধরে কিছুটা টেনে নিয়ে গতি সঞ্চার করে লাফিয়ে উঠলো সীটে ।
তবে সীটে সে বসে না । দুপাশের প্যাডেলে পা রেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্যাডেল ঘোরায় শরীরের ভারে । প্রায় ছফুটের মতো লম্বা দশাসই চেহারা পঙ্খীর । হাট পা গুলো লম্বা লম্বা । প্যান্ট গোটানো । কলারয়ালা গেঞ্জি গায়ে । মাথায় ঝাঁকরা চুল । নাকটা তীক্ষ্ণ । বাজ পাখির মতো । সে জন্যে ওর নাম পঙ্খী । পঙ্খিরাজ । গাঁয়ের রঙ তামাতে । এই সময় কেন জানি পঙ্খীর শরীরে অমানুষিক শক্তি ভর করে ।
পঙ্খী বেপরোয়া গতিতে ভ্যান চালিয়ে নিয়ে যায় বাজারের মধ্য দিয়ে । হুইসেলের রবারের হাওয়া পাম্প নেই । পিতলের বাঁশিটা মুখে দিয়ে হুইসেল বাজাতে বাজাতে অটো স্ট্যান্ডের সামনে দিয়ে, রিকশা স্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে, ভ্যানঅলাদের নাকের উপর দিয়ে দ্রুত বেগে ঝড়ের গতিতে পাঁচ পাঁচজন সওয়ারি নিয়ে বেরিয়ে গেলো পঙ্খী ।
ধাতস্থ হয়ে বিষয়টা অনুধাবন করার আগেই পঙ্খী ওদের নাগালের বাইরে চলে গেলো । যে যার যায়গায় পজিশন নিয়ে বলতে লাগলো, খুবই বাড় বাড়িছে বদমাশটা । শালকে এমন শিক্ষা দেবো না আজ । আগে প্যাসেঞ্জার নামিয়ে ফিরে আসুক । একবার । ওর পা ভেঙে খোঁড়া করে দেবো জীবনে আর কোনও দিন অ ভ্যান চালাতে পারবে না ।
পঙ্খিকে এভাবে প্যাসেঞ্জার নিয়ে যেতে দেখে উৎসাহিত হয়ে উঠলো আউটের অন্যান্য ভ্যানঅলারা । হারু, দিনু, বংশী, ফড়িং আর কালিপদরা । তারা পঙ্খীর সাহসিকতায় আড়ালে আবডালে ঘপ্তি মেরে থকে বলা বলি করতে লাগলো, পঙ্খীর সাহস আছে । হিম্মত আছে । বুকের পাটা আছে । একেবারে পাঁচ পাঁচজন সওয়ারি নিয়ে কিভাবে সবার সামনে দিয়ে তুড়ি মেরে চলে গেলো ।
ওরা ওকে ছুঁতেই পারলো না । ফড়িঙ বলল,পঙ্খী পারলে আমরা পারবো না কেন ? রোজ রোজ একই হুজ্জতি । মেইন রাস্তায় আমাদের ভ্যান চালাতে দেবে না । প্যাসেঞ্জার তুললে নামিয়ে নেবে । জরিমানা করবে । গালাগাল দেবে । কিল চড় লাথি মারবে । ওরা আমাদের পেয়েছে কি । রাস্তা কি ওদের বাপ ঠাকুরদার সম্পত্তি ।
ওরা যে সাত হাজার টাঁকা দিয়ে লাইন কিনেছে সমিতির কাছ থেকে ।দিনুর কথায় রাজু বলে,
সাত হাজার টাঁকা দিয়ে লাইন কিনেছে বলে ওরা এই রুটের মাতব্বর হয়ে গেইচে ।দেশটা কি মগের মুলুক নাকি ।
চল আমারাও যাই পানু বাবুর কাছে । বলি গিয়ে আমরাও একটা সমিতি বানাতে চাই । দেখি উনি কি বলেন ?
বললেই পানু বাবু আমাদের পারমিশন দেবে নাকি । পানু বাবুর উপরঅলা আছে । সে বড় হাঙ্গামা হবে ।
হলে হবে । তাই বলে এভাবে আমরা আর কতো পড়ে পড়ে মার খাব ।
একটু ভিতু কালিপদ বলে, মুখে বলা সোজা । কিন্তু করা খুবই কঠিন । ভেবেছিস ওরা পঙ্খিকে ছেড়ে দেবে ।
ছেড়ে দেবে না তো কি করবা । পঙ্খীর ভাড়ার টাঁকা কেড়ে নেবে । দেশে এতো অরাজকতা এখনও হয়নি ।
একবার পঙ্খীর ভারার টাঁকা ওরা কাড়ুক তো দেখি ।
কেন । জোর যার মুলুক তার । ভাড়ার টাঁকা কেড়ে নিলে আমরা কি করতে পারি ।
কি করতে পারি মানে । আমারা সবাই গিয়ে পঙ্খীর সঙ্গে দাঁড়াবো । দেখি ওরা কি করে পঙ্খীর টাঁকা কেড়ে নিতে পারে ।
শহরতলির ইষ্টিশনে প্যাসেঞ্জার নামিয়ে পঙ্খী কুড়ি টাঁকা পেলো । তখন তার সারা শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে । তবু তার চোখে মুখে বিজয়ের হাসি । একটা যুদ্ধে জয়ের আত্মতৃপ্তির গর্ভে পঙ্খী গামছা দিয়ে গাঁয়ের ঘাম মুছে ফর্সা দাঁতে একটু হাসলো । বিজয়ের হাসি । একটু পরেই পঙ্খী টের পেলো তার পেটের খিদের অনুভূতিটা । কাল রাতে সে রকম খেতে পারেনি । ফুলি মামির ঘরে সে রকম চাল, আটা আর জ্বালানি ছিল না ।
খাল পাড়ের সখারামের মুদিখানা থেকে পাঁচশো আটা এনেছিল ফুলি মামি ধরে । আর ঐ সখারামটা কি ত্যাঁদড় পাজির পাঁজি বদমাশ । পঙ্খীর মুখের উপর বলে দিলো তরে তো ধার বাকিতে কোনও মাল দেয়া যাবে না পঙ্খী । তুই এখনে কখন থাকিস আর না থাকিস তার তো কোনও ঠিক নেই । আমার দোকানে ধারে খেয়ে ফুড়ুত করে উড়ে গেলে আমি ধরব কাকে ? তুই আগে একবার ছাব্বিশ টাকার চাল-ডাল, তেল-নুন, আলু -পেঁয়াজ নিয়ে টাঁকা না দিয়ে কোথায় যেন বাঁশি বাজাতে চলে গেলি । দু মাস পরে ফিরে এলে তোর কাছে টাঁকা চাইতেই তুই আমাকে মিথ্যেবাদী বললি, তোমার টাঁকা তো আমি দিয়ে গেইছি কাকা । আবার তুমি আমার কাছে টাঁকা চাইছ । বলে তুই আমাকে শাসিয়েছিলি । সেদিনের কথাকি আমি ভুলে গেছি ভেবেছিস ।
হ্যাঁ, টাঁকা তো আমি তার পরদিন তোমাকে দিয়ে গেছিলাম তুমি ভুলে গেছ । পঙ্খী কারো কোনও দিন এক পয়সাও মারে না । বুঝেছ । বলে পঙ্খী রাগে গজ গজ করতে করতে চলে এসেছিলো ।
পরে ফুলি মামি গিয়ে চাইতেই দিয়েছিলো সখারাম । পাঁচশো আটা আর একশো গুড় । পঙ্খীকে ধারে দিলো না সখারাম আর ফুলিমামি গিয়ে চাইতেই দিয়ে দিল । তবেকি ফুলিমামির রূপ যৌবন দেখে । সেই রাগে মামীর বানান রুটি খাবে না বলে কিছু সময় গোঁ ধরে ছিল পঙ্খী । শেষে ফুলিমামির অনেক বলা কয়াতে খেয়েছে পঙ্খী ।
কুড়ি টাকা হাতে পেয়ে পঙ্খী ভাবল মামুর দোকানে গরম গরম কচুরি খাবে ছোলার ডাল দিয়ে । এই ইষ্টিশন চত্বরে মামুর কচুরি আর গরম গরম জিলাপি খুব নাম করা । হাতে গরম কচুরি আর জিলাপি খেতে খুবই ভালো লাগে পঙ্খীর । কিন্তু মামুর দোকানের সামনে ভ্যান দাড় করিয়ে পঙ্খী ভাবল না থাক । আমার মামা মামি ও তো কাল থেকে আধপেটা খেয়ে আছে । একবার ভাবল ওদের জন্যেও নিয়ে যাই না কেন গরম গরম কচুরি আর জিলাপি । তা হলে তো তিন জনে বেশ ঘরে বসে খাওয়া যাবে ।
কিন্তু দোকানে গিয়ে সেটাও পারলো না পঙ্খী । এভাবে কচুরি আর জিলাপি নিয়ে গেলে মামি হয়তো রাগ করবে । সখারাম টাঁকা পাবে । আগের ধারের টাঁকা দিয়ে মামি হয়তো আবার ধারে চাল ডাল তেল নুন নেবে । এই ভাবেই তো চালাতে হচ্ছে আজকাল । আর সখারাম যা ঘড়েল । যদি একবার জানতে পারে যে তার দোকানের ধারের টাকা না দিয়ে জিলিপি কচুরি খাওয়া হচ্ছে তাহলে সে আর ধার বাকিতে চাল ডাল দেবে না আর । বলবে, আমার দোকানের ধার না মিতিয়ে তোমরা মজা করে কচুরি জিলাপি খাচ্ছ । আর তো তোমাদের ধারে জিনিস দেয়া যাবে না । এতো সব ভেবে পঙ্খী প্রথম ভাড়ার টাঁকা নিয়ে ব্রিজের কাছে চলে আসে ।
ব্রিজের উপর নেত্যকাকা তার সাগরেদ জগা ভোলা রামুদের নিয়ে পঙ্খির অপেক্ষায় ওত পেতে ছিল । পঙ্খীর এই বাড়াবাড়ির একটা হেস্তনেস্ত না করলে নয় । পঙ্খী ভেবেছে কি ? আজ ও যেটা করলো কাল থেকে আউটের অন্যান্য (হিরু কালু বংশী কালিপদরা ) ভ্যানওয়লারাও যদি সেটা করে তা হলে তাঁদের এতো টাঁকা দিয়ে সমিতির থেকে লাইন কেনার কি মানে হয় । পঙ্খীর এই বেয়াদবির উচিৎ শিক্ষা যে করে হোক দিতে হবে । যাতে ও আর কোনও দিন এমন কাজ করতে না পারে । এবং ওকে দেখে আর কেউ কোনও দিন হিরু বংশী দিনু কালিপদরাও আউটের প্যাসেঞ্জার তুলবে না । ওদের মধ্যে জগার সঙ্গে পঙ্খীর পুরনো একটা ঝামেলার ক্ষার ছিল । এই মওকায় জগা প্লান করে যে, পঙ্খীর সঙ্গে ঝামেলা বেঁধে গেলে সে সুযোগ বুঝে পঙ্খীর একটা পা ভেঙে দেবে যাতে করে পঙ্খী আর কোনও দিন ভ্যান চালাতে না পারে ।
পঙ্খী ভ্যান নিয়ে ব্রিজের উপর আসতেই নেত্যকাকার সঙ্গে ভোলা জগা রামুরা সাত আটজনে এক সঙ্গে পঙ্খীকে ঘিরে ধরল । ঠিক যেমন চক্রব্যূহে সপ্ত মহারথী মিলে অভিমন্যুকে ঘিরে ধরেছিল ।
এই কতো ভাড়া মেরেছিস বের কর । রোজ রোজ আমাদের বাড়া ভাতেথকর দিয়ে গতর বাড়াবি । তুই ভেবেছিস কি ?
আত নয় হাজার টাঁকা দিয়ে আমরা লাইন কিনেছি কি করতে । তোকে এইভাবে আমাদের প্যাসেঞ্জার তুলে নিয়ে যাবার জন্যে ? এয়া । তুই ভেবেছিস কি । রজ রজ তুই আমদের সামনে থেকে প্যাসেঞ্জার তুলে নিয়ে যাস ।
পঙ্খীকে কোনও কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে একের পর এক প্রশ্নবাণে পঙ্খীকে ঘায়েল করতে চাইলো ভোলা নেত্যকা আর রামুরা । পঙ্খী তার ভ্যানের সীট থেকে লাফ দিয়ে নিচে নেমে একে একে সবাইকে তাকিয়ে দেখে বলে, তার মানে আমি কতো টাঁকা ভাড়া মেরেছি তা তোমাদের দেখাতে যাব কেন ? তোমরা যখন ভাড়া মার তখন ।
ওরে হারামজাদা বদমাস । তোর এতো বড় সাহস। তুই আমাদের মুখের উপর তড়পাস । তুই এতো বড় সাহস পাশ কি করে ? তোকে না বলা হয়েছে এই রাস্তায় প্যাসেঞ্জার তুলবি না।
কেন তুলবো না কেন ? রাস্তা কি তোমাদের বাপের জমিদারি নাকি ?
তুই কি বললি ? তুই হারামজাদা বেজন্মা আমাদের বাপ তুলিস । তুই এতো বড় সাহস পাশ কোথা থেকে ?
কেন, টাঁকা বার করবো কেন ? আর আমাকে মা বাপ তুলে গালাগাল দিলে ভালো হবে না বলছি ।
টাঁকা দে বলচি পঙ্খী । না হলে তোর কপালে শনি আছে । হু গালাগাল দেবে না আবার । দিলে তুই কি করবি ?
দেবো না টাঁকা দেখি তোমরা আমার কি করতে পার করো ।
তা হলে দেখতে চাষ তুই ? আমরা তোর কি করতে পারি ? হ্যাঁ, দেখাও তোমরা আমার কি করতে পার ।
পঙ্খীর কথা শেষ হতে পারে না । জগা ভোলা রামুরা একসাথে ঝাপিয়ে পরে পঙ্খীর উপর । লাথি, চড়, কিল ,ঘুসি যার যে রকম খুশি মারতে থাকে । পঙ্খীও পড়ে পড়ে মার খেতে পারে না । আর এই সময় পঙ্খী যেন শুনতে পেলো তার খান সেনাদের হাতে শহীদ হওয়া বাবার ডাক, পঙ্খী মার খাস না । রুক্ষে দাড়া, রুক্ষে দাড়া পঙ্খী । আমিও আছি তোর সাথে । পঙ্খী মরিয়া হয়ে ওঠে । না । দেবো না বলে । পঙ্খীর সেই চিৎকারে ছুঁটে আসে দিনু, বংশী, কার্ত্তিক ফড়িঙরা । তারাও হাক পাড়ে, না পঙ্খী কিছুতেই দিবি না তোর হকের ভাড়ার টাঁকা । দিবি না । আমরাও আছি তোর সঙ্গে । পঙ্খী হে পঙ্খী । হে পঙ্খী হে ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ