দৃশ‍্যকল্প ২ - তাহমিনা রহমান


ক'দিন যাবৎ শরীরে যেন অনবরত পিঁপড়ে কামড়াচ্ছে । বিশ্রী এক অনুভূতি । সেই সাথে চলছে বিবেকের সাথে বোঝাপড়া । আমরা আসলে যা কিছু দেখে অভ‍্যস্ত হয়ে উঠি সেগুলোর ভালোমন্দ নিয়ে ভাবিনা । এ ঘটনা থেকে শিখলাম আমরা যা জানি সবসময় তা ঠিক নাও হতে পারে । আমার এ শিক্ষাটা হয়েছে সম্প্রতি ভয়াবহ , নিষ্ঠুরতম এক দুর্ঘটনা থেকে । এ ভয়াবহতা চোখে দেখার মতো না তবু দেখতে হয়েছে । মেয়েটি এ্যপার্টমেন্টের সবাইকে টেনে এনে একসাথে করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে , দেখতে বাধ্য করেছে ।


প্রথম যেদিন ম‍্যাসেঞ্জারে কিছু মানুষের নগ্ন কর্মকাণ্ড দেখেছিলাম সেদিন‌ও আমার এমন হয়েছিল । এখন অবশ্য গা- সোয়া হয়ে গেছে । সামনে আসা মাত্রই ব্লক করে দেই কারণ গোপন বিষয়ের গোপনীয়তা নষ্টের পক্ষে আমি ন‌ই । এতে শারীরিক ইন্দ্রিয়ের বিনাশ সাধিত হয় । মনে মনে ওই শ্রেনীটাকে গালাগাল দিই। বলি এরা নিজেরা পঁচেছে এবং সমাজটাকে পঁচাচ্ছে । তরুণ তরুণীদের বিভ্রান্ত করছে । সমাজে ধর্ষণ ব‍্যাভিচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে , বাড়ার পেছনে এদের ইন্ধন আছে । গভীর ভাবে ভাবলে যে সত্যিটা বেড়িয়ে আসে তাহলো পরিকল্পিত ভাবে দেশের যুবশক্তিকে ধ্বংস করা হচ্ছে ।
এ সমস্যার সমাধান না হয় কেউ কেউ তাদের ব‍্যক্তিসত্ত্বার উপর প্রয়োগ করতে পারে কিন্তু পুরো সমাজ কী করছে ! কিভাবে এর থেকে পরিত্রাণ মিলবে ! অমন সব ভীতিকর ভাবনা ক্রমেই আমাকে পঙ্কিল কর্দমাক্ত নর্দমার দিকে ঠেলে দিচ্ছে । পুঞ্জীভূত এই দুর্গন্ধ থেকে পরিত্রাণের আগেই আরও একটা অচেনা অনুষঙ্গ আমাকে আক্রমণ করে বসলো ।


ইদানিং মামুন‌ও আমাকে এড়িয়ে চলছে । দিব‍্যি অফিস করছে । বোয়ার হাতের রান্নাতেও কোন আপত্তি নেই । এতোবড় একটা ঘটনা বেমালুম নিঃশেষ হয়ে গেলো ! তার গায়ে একটা ফুলের টোকাও পড়লোনা ! মামলার তদন্তে বলা হয়েছে - এটি স্রেফ আত্মহত্যা । সি সি ক‍্যামেরায় দেখা গেছে মেয়েটা একাই হেঁটে হেঁটে ছাদে উঠেছে এবং ছাদের গেট লাগিয়ে দিয়েছে । তারপর দশতলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েছে । ঘটনা শেষ । কিন্তু মামুন আমাকে এড়িয়ে চলছে কেন । আমার মুখোমুখি হতে তার কী সমস‍্যা ! তার একটা কথায় আমার সমস‍্যাটা আরো বেড়েছে । সে বলেছে - পতঙ্গ যদি পুড়ে মরতে চায় তাকে ফেরাবে কে ? ওই মেয়েটিকে সে পতঙ্গ বলেছে । একটি চৌদ্দ পনের বছরের ফুটফুটে মেয়ের পাখা গজিয়েছিলো । সে উড়ে গিয়ে আগুনে পড়েছে অতঃপর পুড়ে মরেছে । তাহলে মেয়ের বাবা কেন তাকে অভিযুক্ত করে আদালতে মামলা করলো কেন সাংবাদিকদের কাছে মামুনকে দায়ী করলো ! বুঝলাম মেয়ের বাবার অভিযোগে পুলিশ কোন সত‍্যতা পায়নি ‌। তাই মামলা শেষ । কিন্তু শেষ বললেই কী সব শেষ হয়ে যায় ! সব সত‍্যের কী প্রমাণ থাকে । মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে এর পেছনে একটি কারণ যে আছে তাতো আর অস্বীকার করার উপায় নেই । এই এ্যপার্টমেন্টের এতোগুলো মানুষ তারা কেউ দোষী নয় , দোষী একমাত্র মামুন ! এ যন্ত্রনা মন থেকে মুছবো কী করে ।


আজ শুক্রবার । ছুটির দিন । সকাল থেকেই সিঁড়িতে ধুপধাপ শব্দ ‌। ওরা বাসা ছেড়ে যাচ্ছে ,যেন বাসা ছেড়ে চলে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে । শব্দ যেন আর থামছেই না ।
ক্রমেই শব্দগুলো প্রতিবাদী হয়ে উঠে এবং আমার মাথায় দানবীয় আক্রমণ ঘটায় । আমি এ্যপার্টমেন্টের সব মানুষের গোল চত্ত্বরে মামুনকে দেখতে পাই । সবাই মামুনের দিকে পাথর ছুঁড়ে মারছে । মামুন একের পর এক পাথরের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে । আমি চিৎকার দিয়ে উঠি - মারো , ওর মৃত্যু নিশ্চিত না হ‌ওয়া পর্যন্ত পাথর ছু়ঁড়তে থাকো ।
মামুন পাশের রুম থেকে ছুটে আসে । অনেক দিন পর আমার পিঠে হাত রাখে সে । আমার ধাতস্থ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগে । মামুন আমার পিঠে হাত বুলাতে থাকে । আমি সরে যাইনা বরং ওর আচরণে বিস্মিত
হ‌ই । ওকে প্রশ্রয় দিই । ওর মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করি । অনেকক্ষণ পর মামুন আস্তে আস্তে বলে - নীলা তুমি অন‍্যের সমস্যা আমাদের মাঝে কেন টেনে
আনছো ‌। আমি ডানাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতাম । ওরা আমার বিরুদ্ধে অমন একটা জঘন্য অভিযোগ আনবে ভাবতেও পারিনি । ডানার আত্মহত্যার কারণ সবচেয়ে বেশি জানে ওর বাবা মা । অথচ পুরো বিষয়টা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে । ওরা আমার মানসম্মানে আঘাত করেছে । মনে হচ্ছে আমার‌ও এখানে আর থাকা হবেনা ।


মামুনের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার ভাবনাগুলো সব ওলটপালট হয়ে যায় । ওর মুখে অদ্ভুত একটা অসহায়ত্ব নেমে এসেছে । আমি আৎকে উঠি । মামুনের এই অসহায়ত্বের শেষ পরিননতি কী ! আমিও কী তাহলে আরো একটা আত্মহত্যার চোরাবালি প্রস্তুত করছি ! অকস্মাৎ প্রতিবেশটা পাল্টে যায় ‌।


অনেক দিন পর আমিও মামুনের পিঠে হাত রাখি ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ