মিলনের পথে (পর্ব - তিন) - সুদীপ ঘোষাল


গোপালবাবু বলেন, রাতের পর রাত জেগে বাংলার সাধারণ মানুষ কৃষক, তাঁতী, কামার ,কুমার, জেলে দেখেছে যাত্রায় কাহিনি আর মেতেছে পালা গানের সুরে। কখনো ভক্তি, কখনো ভালোবাসা, কখনো দেশপ্রেম তাকে কাঁদিয়েছে, হাসিয়েছে। আবার সামন্ত রাজা, জমিদার ও অভিজাত শ্রেণির মানুষও যাত্রা দেখেছে। জমিদারবাবু তো আর সাধারণ প্রজার সঙ্গে যাত্রার আসরে গিয়ে বসবেন না। বরং তার প্রাসাদের নাটমণ্ডপেই বসবে যাত্রার আসর। জমিদারবাড়িতে থাকতো বিশাল নাটমণ্ডপ। সেখানেই যাত্রা, পালাগান, কীর্তনের আসর বসতো। চিক বা পর্দাঘেরা বারান্দায় বসতেন জমিদার গৃহিনী, রানীমা, পরিবারের নারী সদস্যরা। তারা চিকের আড়াল থেকেই দেখতেন যাত্রা পালা।যাত্রাপালার ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন। অষ্টম ও নবম শতকেও এদেশে পালাগান ও পালার অভিনয় প্রচলিত ছিল। শ্রী চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের আগেও রাঢ়, বঙ্গ, সমতট, গৌড়, পুণ্ড্র, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল, শ্রীহট্টসহ সমগ্র ভূখণ্ডে পালাগান ও কাহিনিকাব্যের অভিনয় প্রচলিত ছিল। ধর্মীয় বা কোনো উৎসবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার যে রীতি সেখান থেকেই যাত্রা শব্দটি এসেছে। এদেশে শিবের গাজন, রামযাত্রা,কেষ্টযাত্রা, সীতার বারোমাসী, রাধার বারোমাসী প্রচলিত ছিল। সেসময় বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি অভিনয় করে দেখানো হতো। সেখান থেকেই যাত্রার উৎপত্তি। নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের পর কৃষ্ণযাত্রা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কৃষ্ণযাত্রায় মূলত রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা, কৃষ্ণের বাল্যকাল, মা যশোদার সঙ্গে কৃষ্ণর বাল্যক্রীড়া, কৃষ্ণের কংসবধ, মথুরা জয় ইত্যাদি কাহিনি অভিনয় ও গানের মাধ্যমে দর্শকদের পরিবেশন করা হতো। দর্শকরা তা দেখে ভক্তিরসে সিক্ত হতেন। রুক্মিণী হরণ নামে একটি কৃষ্ণযাত্রায় চৈতন্যদেব নিজেই অভিনয় করতেন। তিনি রুক্মিণী সাজতেন।জামাটা গায়ে দিয়ে জুতাে পরে বেরিয়ে পড়লাে বন্ধু সুব্রতর সঙ্গে। সুব্রত অরিন্দমের বন্ধু। সুব্রত ব্যানার্জী। সেও অভিনয় করে অরিন্দমের সঙ্গে। অভিনয়কে ভালােবাসে। কিন্তু তার ঘরের অবস্থা অরিন্দমের থেকে ভালাে। ফলে সে অভিনয়টাকে পেশা হিসেবে নিতে চায় না। নদীর ধারে বসে বসে দুই বন্ধুতে অনেক গল্পই করলাে। তারা আবৃত্তি নিয়ে আলােচনা করল। অরিন্দম আবৃত্তি করে শােনাল সুকান্তের ঐতিহাসিক। "আজ এসাে তােমাদের ঘরে ঘরে পৃথিবীর আদালতের পারায়ানা নিয়ে।" তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। আর আপনাকে বললাম তোমাকে একদিন আমার বোনের সাথে পরিচয় কলি, সী। অনিন আজ গাল অপ্ণা বললাে, আরে মশাই দেবীকা হচ্ছে আমার প্রিয় বান্ধবী। অরিন্দন দুপুরটা অভিনয় আর আবৃত্তির চর্চা করে কাটিয়ে দিলাে। চারটি ঘরের মলো। একটি ঘর নিজের মতাে করে সাজিয়ে নিয়েই তা ব্যবহার করে। শুধুমাত্র কিছe দিয়ে সে শুধু নিজের সাধনা চালিয়ে যায় যতরকম অভিনয় সংক্রান্ত উপদেশমূলক আছে তার কোনটাই তার বাদ যায়নি। আবার মাঝে মধ্যে সে গােপালবাবুর কাছে যায়। গােপালবাবু একজন সুদক্ষ অভিনেতা। তার কাছে গিয়েও অনেক উপকার অরিন্দমের। কিন্তু মন তার বােঝে না শুধুমাত্র অভিনয় শিখে একটা মানুষ তার সব আশা পূর্ণ করতে পারে। গােপালবাবু বলেন, অভিনয় সর্বপ্রথমে জ্ঞান দেয়, সম্মান দেয় আর তার সঙ্গে দেয় অর্থ। সেই অর্থই এখন প্রয়ােজন অরিন্দমের। দ্বাদশ শ্রেণি অবধি পড়ে আর পড়াশুনা হয়নি অরিন্দমের কিন্তু অরিন্দম বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ এবং শান্ত প্রকৃতির। গোপালবাবু বলেন, অরিন্দম অভিনয় কখনও অভিনয় বলে নিও না। চরিত্রের মধ্যে প্রবেশ করার চেষ্টা করাে, তারপর তােমার ভাব প্রকাশ করাে। | এইসব চিন্তা করতে করতে অরিন্দম প্রায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাে আর ঠিক সেই মুহুর্তে বৌদি মনীষা এসে বললাে, ঠাকুরপাে এখনও তােমার অভিনয় সাঙ্গ হলাে না। এবার ওঠো জাগাে চেয়ে দেখাে, সম্মুখে রয়েছে এক পেয়ালা চা আর -- ‘মাের মাতৃসমা স্নেহশীলা বৌদি।। বাব্বা! তুমি এতও পারাে বলে বৌদি কাজে চলে গেলেন। বিকালে এক কাপ চা। পেলে যেন অরিন্দম হাতে স্বর্গ পায়। কিন্তু আবার ভাবে এক কাপ চায়েরও দাম চল্লিশ। পয়সা। অরিন্দম ভাবলাে চাকরী তাকে একটা জোগাড় করতেই হবে। আরে কি চিন্তা করছিস। চল একটু ঘুরে আসা যাক্। বন্ধু সুব্রত বললাে।কাছে গেছে ভোরে উঠে।অরিন্দম ভাবে চাকরি না হলে যাত্রাদল সে করবেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ