নিয়তি - ধ্রুব বসাক

মৃত্যুকে আমি কখনো ভয় করি না,আবার সাদরে গ্রহণও করি না।মাঝে মাঝে আমার ভাবনাগুলোও আমার মৃত্যুর কারণ হয়ে সাড়া দেয়।প্রত্যেকটি মানুষের নিজস্ব কিছু প্রাপ্তি থাকে,কর্মনির্ভর কিছু ফল থাকে।আমরা প্রত্যেকেই পৃথিবীতে সৃজনকালের এক একটা সৃষ্টি। আমি বা আমরা প্রত্যেকেই আমাদের পিতা-মাতার কাম-বাসনার একটা প্রাপ্তি মাত্র।সৃষ্টি সম্ভারের এরূপ কল্পনাই আমাদের জন্মকাল। এই জন্মকালই আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। পক্ষান্তরে, মৃত্যুকে তবে কি আমরা জীবনের অন্তিম প্রাপ্তি বলতে পারিনা?

আমরা প্রত্যেকেই আমাদের মৃত্যুকে কখনো না কখনো আহ্বান  করে থাকে। কেউ বিরহে, কেউ আবেগে। আচ্ছা বিরহ এবং আবেগের এর মধ্যে পার্থক্য কি? আমার ব্যক্তিগত ভাবনার দৃষ্টিকোণ থেকে মৃত্যুকে খুবই তুচ্ছ মনে হয়। কারণটা যদিও জানি না। তবে মৃত্যু নিয়ে ভাবতে ভাবতে আজ আমি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে ঠাঁই পেয়েছি।

জন্ম-মৃত্যু এগুলো নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার মনোভাবকে আমার খুব হাস্যরসাত্মক মনে হয়। আমি প্রথম যেদিন জানতে পেরেছিলাম, আমি আমার জীবনের অন্তিম শিখরে পৌঁছে গেছি,আমার খুব হাসি পেয়েছিল। কারন, আমি আমার শেষ প্রাপ্তি অর্জন করেছিলাম খুব অল্প বয়সে। এই প্রাপ্তিকে নিয়তি বললেও ভুল হবে না। ডাক্তারের তথ্য অনুসন্ধানের ভিত্তিতে আমি একজন মৃত্যু-পথযাত্রী।প্রতিনিয়ত ব্রেন-ক্যান্সারকে সঙ্গী করে জীবনের পথ চলাকে দীর্ঘ করে চলেছি।সঙ্গী করে নিয়েছি এক টুকরা খিলি পান কে। বিশ্বাস করুন, এতে আমার বিন্দুমাত্র কষ্ট হয় না।বরংচ আনন্দ প্রাপ্তি বহুগুণে বেড়ে যায়। সবে মাত্র একুশে পা রেখেছি!
জীবনের তাগিদে এই বয়সটা আমার জন্য অতি অল্প। যৌবনে পদার্পনের প্রথম ধাপ, জীবনে প্রেমে পড়ার সুবর্ণ সময় বললেও ভুল হবে না;হয়তোবা প্রেমেও পড়েছিলাম কোন এক নারীর!তবে তাকে কখনো সে কথা বলার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। অনেক মানুষের ভালোবাসা পেতে পেতে আমিও যেন একদিন ভালোবাসার কোষাগারে পূর্ণ হয়ে উঠেছিলাম। মনে মনে চেয়েছিলাম ভালোবাসার কোষাগার কে ভালোবাসা শূন্য  করতে! এমন একজনকে ভালবাসবো যাকে সমগ্র ভালোবাসা-টুকু দিয়ে পূর্ণ করবো, তেমনি হল -
দিনটি ছিল শুক্রবার, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গিয়েছিলাম ডাক্তার খানায়। ডাক্তার-খানায় যাওযার তেমন কোনো কারণও আমার ছিল না। পরিবারের অন্যদের সমস্যা থাকায় সাথে গিয়েছিলাম, সাথে ছিল বোন। বোনকে ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে আমি বাইরের বারান্দায় বসে ছিলাম।দক্ষিণ-মূখী বারান্দা হওয়ায় সমগ্র সময়টা ধরে দক্ষিনা বাতাস উপভোগ করলাম, সত্যিই সেই মুহূর্তটা ভুলবার নয়। মৃদু বাতাস,বাইরে সবুজ অরণ্যে সব মিলিয়ে যেন এক নন্দন-কানন! এদিক-ওদিক দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগলাম।

হঠাৎ,ক্ষণিকের জন্য হলেও চোখদুটি যেন থমকে গেল;
কিছুতেই পলক ফেরাতে চায় না তার থেকে,
হ্যাঁ এটাই সত্য!
কারন তখন আমার চোখ দুটি কোন এক নারীকে অবলোকন করেছিল। কিছুতে-ই বাঁধা দিতে পারলাম না এবং আমি এটাও লক্ষ্য করলাম মেয়েটিও আমার দিকে কেমন একটা মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল সেও আমাকে কিছু বলতে চায়, কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলাম ;
এ যেন আমার জনম জনম ধরে বয়ে চলা উথাল প্রেমের কাহিনী। কোন এক জনমে হয়তো খুব ভালোবেসে তাকে আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম,অনেক অনেক অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সে যেন আজ হঠাৎ দেখা দিল।টানাটানা চোখ,কিছুতেই যেন পলক সরাতে মন চায় না।ইচ্ছা করে,তার ঐ রক্তজবার মতো ঠোঁটে চুম্বন এঁকে দিতে।হাতে হাত রেখে বুঁকে জমিয়ে রাখা সব কথা, সমগ্র ভালোবাসাটুকু তাকে বিলিয়ে দিতে।পরিণামে একবিন্দু ভালোবাসা চাই তার থেকে।
ভাবতে ভাবতেই কেঁটে গেল প্রায় দু-ঘন্টা।ডাক্তার কক্ষ্য থেকে হঠাৎ ডাক পেলাম,এবার আমার সিরিয়াল।সুন্দর, সাবলীল হাসিমুখে ডাক্তারের কক্ষ্যে প্রবেশ করি।যদিও তেমন কোন মারাত্মক সমস্যা জানামতে আমার ছিল না।মাঝে মাঝে একটু মাথা ব্যাথা করত।যার জন্য এখানে আসা।সবকিছু ডাক্তারের কাছে বিস্তারিত জানালাম।

কিছু টেস্ট দিয়েছিল,টেস্টর রিপোর্ট গুলো নিয়ে এক সপ্তাহ পরে আবার দেখা করতে বলেছিল।কথামত কাজও হলো-
ডাক্তারের কক্ষ্য থেকে বেরিয়েই তীব্র ব্যাকুলতার সাথে তাকে খুঁজতে থাকলাম কিন্তু কিছুতেই তার দেখা মিলল না।মনটা খারাপ হয়ে গেল।মাত্র দু-ঘন্টায় যেন তাকে অনেকটা আপন করে নিয়েছিলাম।যাইহোক, বাড়ি ফিরে এলাম।আমার কিছুকিছু শখের মধ্যে লেখালিখি ছিল অন্যতম, ডায়েরি লিখতে খুব ভালো লাগতো।এই সাতদিন মেয়েটিকে নিয়ে অনেক ভেবেছি, অনেক অনেক গল্পও রচনা করেছি।যেমন-হঠাৎ দেখা,অভ্যাস এরকম আরও অনেক;
গুটিকয়েক কবিতাও লিখেছিলাম।যাইহোক এভাবেই ভাবতে ভাবতে সাতটি দিন শেষ হলো।টেস্টের রিপোর্টগুলো নিয়ে কথামত ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।তবে বলা বাহুল্য, ডাক্তারের কাছে যাওয়ার বিষয়টা পরবর্তিতে পরিবার কিংবা সহপাঠী কাউকেই জানানোর প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম না।তাই একপ্রকার লুকিয়েই গিয়েছিলাম।

ডাক্তার রিপোর্ট গুলো দেখেই আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।কারণ জানতে চাইলাম,উওরে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-
আপনার সাথে কেউ আসেনি?
বললাম না,কেন কি হয়েছে?
কিছুক্ষণ নিরব থেকে দীর্ঘঃশ্বাস ফেললেন,বুঝতে বাকি রইল না যে বড় কোন সমস্যা ধরা পড়েছে।কোন ভাবেই আমাকে কিছু বলবেন না ডাক্তার।একপ্রকার জোর করাতে বলতে বাধ্য হলো-
আপনার ব্রেন ক্যান্সার হয়েছে,তবে-
তবে কি?
আপনাকে বাঁচানো আমার পক্ষে সম্ভব না।আপনি জীবনের অন্তিম পর্যায়ে চলে এসেছেন,এখন ঈশ্বর ভরসা!
বলেই চলে গেল।
কিছুক্ষণ নিরব দর্শকের ভুমিকা পালন করে হঠাৎ হেসে ফেললাম।বহুক্ষণ একা একা হাসতে লাগলাম। এটা ভেবেই ভালোলাগছিল যে,আমি অতি অল্প বয়সেই আমার শেষ প্রাপ্তি অর্জন করতে চলেছি।এর থেকে আনন্দের আর কি কিছু হতে পারে?তবে নিয়তির খেলায় জীবনের প্রাপ্তি কিছুটা হলেও অপূর্ণ থেকে গেল।ভালোবাসার মানুষটিকে মন খারাপের গল্পটা বলা হয়ে উঠল না।
কি হবে মনে খারাপের গল্প বলে?
এর চেয়ে মৃত্যুকে সাদরে গ্রহণ করে ভালো আছি বলাটাই শ্রেয়।সঙ্গি বলতে একটি খিলি পানই থেকে গেল অবশেষে...!!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ