শেষ দেখা- অরুরিমা সিনহা

প্রতিদিনের মতো কিরণ সকাল বেলায় উঠে রেওয়াজ করে স্নান করে বাড়ির মন্দিরের জন্য ফুল তুলেছে। বাবাকে অফিস যাওয়ার সময় চা ও বানিয়ে দিয়েছে মায়ের হাতের কাজ ও গুছিয়ে দিয়েছে। তারপর খবরের কাগজ পড়ে নিয়ে সকালের খাবার খেয়ে কলেজে চলে গেছে। কলেজে ক্লাস করে বন্ধু বান্ধবীদের সাথে কফি শপে আড্ডা মেরে রবির সাথে দেখা করতে গেল ঠিক বিকেল পাঁচটায়। রবি কে দূর থেকে দেখে মুচকি হেসে ভাবছে নিশ্চয় এটা রবি নতুন কিনেছে তাই আজ পরে এসেছে। মনে-মনে কিরণ রবির জামার কালারের প্রশংসা করছে কারণ কিরনের পছন্দের কচি কলাপাতার জামা রবির গায়ে ছিল। কিরণ তাই সেই মুহূর্তে কিছু না ভেবে রবি কে জড়িয়ে ধরল রবি হাত দিয়ে সরিয়ে দিল কিরণ ভাবলো পাবলিক প্লেসে নিশ্চয়ই বারাবারি করে ফেলেছে। কিরণ বলল sorry sorry রবি চমকে গিয়ে বললোsorry কেন? তখন কিরণ বলল তোমাকে অনেকদিন দেখিনি তাই ভুলে পাবলিক প্লেসে জড়িয়ে ধরলাম রবি হেসে বলল এই ব্যাপার? কিন্তু আমি আজ তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছিলাম তার আগে চলো ওখানে গিয়ে বসি। কিরণ বলল-একটা কথা কেন? তুমি হাজারটা কথা বল। রবি এদিকে বুঝতে পারছে না কিভাবে বলবে জানেই তো কিরণ একটা পাগলি যার ঘুম ভাঙ্গে রবির একটা ফোনে"কিগো ঘুম থেকে উঠেছো" বলে। আর সেই কিরণ কে কিভাবে বলবে এত বড় কথাটা তাই সে বারংবার রুমাল দিয়ে ঘাম মুছে চলেছে। কিরণ বলে উঠলো কি হল তোমার শরীর ঠিক আছে তো? রবি বললো হ্যাঁ কিন্তু তুমি বারবার ঘামছো কেন?
  তখনই রবি বলে উঠলো আচ্ছা তুমি আমাকে ভালোবাসো তো! কিরণ হেসে উঠল কেন? আমাকে এখনো তোমার অবিশ্বাস নাকি! বিশ্বাস করি বলেই তো আজ একটা সত্যি কথা বলতে এতটা অস্বস্তি করছে। তুমি যদি সত্যি আমাকে ভালোবেসে থাকোতো আমাকে তুমি ভুলে যেতে পারবে ?কিরণ বলল এটা কোন কথা হলো তুমি কি ভুলভাল বকছো বলতো কি হয়েছে তোমার? রবি কিছু কথা বলে দাঁড়িয়ে পড়ল বলে উঠলো আমার পক্ষে এই সম্পর্ক বয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে তাই তুমি আমাকে ভুলে যাও রবি বলল জানি তো তিন বছরের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া টা কঠিন হয়তো কিন্তু এই সম্পর্কটা আমি আর চাই না। তাই আজ থেকে এখানেই সম্পর্কটা শেষ করতে বাধ্য হলাম..। এই বলে রবি কখন যে চলে গেল কিরণ কিছুই  বুঝতে পারল না ‌। কিরণ যখন তার কান্না ভরা দুচোখ মুছে দেখল রবি তার কাছে নেই কখন চলে গেছে সে বুঝতেই পারেনি। এরপর সন্ধ্যা সাতটার ট্রেনে বাড়ি ফিরল কিরণ । রান্নাঘর থেকে কিরনের মা বলে উঠলো আজ দেরি কেন? মা ট্রেনটা লেট এসেছে তাই একটু দেরী হল । এই বলে কিরণ তার রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিজের  সাথে
 নিজের লড়াই শুরু করল। আজকের তার হাতের সেলফোনটা নিষ্ক্রিয় পদার্থ মনে হল। সব যেন বিষাদ লাগতে শুরু করলো মা একবার ডাক দিল খাবিনা? কিরণ বলল মা ঘুমাবো এখন খিদে নেই রাতে উঠে খেয়ে নেব। এটা প্রায়ই কিরণ তার মাকে বলতো তাই তার মা প্রতিদিনের মতো কিরনের দরজা লাগিয়ে দেওয়ার পেছনে কিছু কারন খুঁজেনি। কিন্তু কিরণ আজ যে হেরে গেল ফোন নিয়ে ভাবলো আরেকবার চেষ্টা করে রবিকে কিন্তু তাতে তাঁর লাভ হল না কারণ রবির ফোন switch off ছিল। কিরণ বুঝে নিল আজ তার সমস্ত প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে তাই সে নিজের কাছে জবাবদিহি শুরু করলো "কেন সে বিশ্বাস করে মানুষকে এত সহজে?"আজ 3 বছরের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল। যাকে নিয়ে এত স্বপ্ন দেখা "যে মানুষটা সারা জীবন একসাথে থাকার প্রতিশ্রুতি দিল সে এমন ভাবে ছেড়ে দিতে পারল?" বারংবার রবির কথাগুলো তার মনে পড়ছে। কিরণ তো রবিকে চিনতো না রবি তাকেই চিনিয়েছিলো। স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতো তারপর থেকে রবির সাথে কিরণ এর পরিচয় তারপর এক ট্রেনে বাড়ি আসা তারপর একটু একটু করে বিশ্বাস করতে শুরু করা। যেই রবি তার মনে আশার আলো হয়ে এলো এখন কিরণকে অন্ধকারে রেখে গেল কিরণ ভাবতে শুরু করলো তার পুরনো দিনের কথা। এমনিতেই খুব মিষ্টি স্বভাবের ছিল কিরণ রবির একটু Ego বেশি ছিল ঠিকই কিন্তু কিরণ কে প্রথম তার হৃদয়ের কথা বলেছিল। কিরণ তবু তাকে বুঝিয়ে ছিলো ভালোবাসা বলে কিছু হয়না আমরা ভালো বন্ধু থাকতে চাই কিন্তু রবি কিরণ কে নিজের হাতে ভালোবাসার বর্ণপরিচয় থেকে শেষের কবিতা পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে এখন ছেড়ে দিল। রবি ছাড়া কিরণ অসম্পূর্ণ কিন্তু কিরণকে ছাড়া রবি কিভাবে থাকবে? যার গলার স্বরে কিরনের ঘুম ভাঙতো সে রবির কণ্ঠস্বর আর কোনদিন ও কিরণ শুনতে পাবে না তাকে দেখতে পাবে না এসব কথা ভাবতে ভাবতে কিরণ ভেঙে পড়ল কাঁদতে কাঁদতে কিরনের দুই চোখ ফুলে গেল কিরণ ঘুমিয়ে পড়ল। পরেরদিন সকাল তার কাছে আর ভালো লাগলো না আজ কলেজে গেল না বাড়িতে থাকতে ও তার আর ভালো লাগলো না। কিরণ আজ আকাশের দিকে তাকিয়ে কত কিছু ভাবলো তার বারান্দার গাছগুলোকে জড়িয়ে কাঁদছে। রবিহীন জীবন কিরণ যেন ভাবতেও পারল না তবুও তাকে মেনে নিতে হবে। এক সপ্তাহ কলেজে এলোনা কিরণ। কিরনের বান্ধবীরা সবাই কিরণ এর জন্য উদ্বিগ্ন ফোন করলে কিরণ ধরে বলে ওর জ্বর হয়েছে। কিরণ কোনদিনও মিথ্যে কথা বলেনি আজ বলতে হল কারণ  রবির মিথ্যে ভালোবাসার  কাছে হেরে গেছে সে। এক সপ্তাহ পর  কলেজ গেল কিরণ অগোছালো হয়ে।  বাড়ি তাড়াতাড়ি ফিরতে চাইলে বান্ধবীরা জোর করলো কফি শপে যাওয়ার জন্য । কিন্তু সে কোন কথা না শুনে স্টেশনে চলে গেল ।সেই স্থানে গেল যেখানে রবি কিরনের প্রথম সাক্ষাৎ এবং রবি কিরনের অজস্র স্মৃতি কিন্তু আজ সবই যেন বিষাদগ্রস্ত লাগল। বাড়ি ফিরে এল তাড়াতাড়ি এসে দরজা বন্ধ করে কান্না শুরু করলো এইভাবে এক মাস ধরে রবিহীন কিরণ যেন অনেকটা নিজেকে গুছিয়ে নিল তার মনে পরতে লাগলো শেষ দেখার কথা...।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ