দৈত্য - আশরাফ উল আলম শিকদার



ছটা পনেরো। যাবিনের কোনোই তাগিদ নেই বেরিয়ে পড়ার। জিন্সতো পরণেই আছে। একটা টি-সার্ট গলিয়ে নিয়ে ফিস ফিস করে বডি স্প্রে মেরে নিলেই হলো। পায়ে বাইরে পরবার বার্মিজ চপ্পল।

মোবাইল সুইচড-অফ নয়, তবে ফেসবুকে ঢোকা যাবে না। জাতীয় নাট্যশালার মাঠে বসে আছে রুশা, প্রায় মিনিট দশেক। যাবিনকে ফেসবুকে দেখলেই রুশা মেসেজ দিয়ে বসে। ফোনে তো টেক্সট আসছেই। শেষে বিরক্ত হয়েই বের হলো ঘর থেকে। বেরোবার আগে রুশার কল ধরেই সাত আটবার সরি-সরি বলে নিয়ে খুবই দুঃখিত কন্ঠে বলে, “এইতো, জান আসছি। আসছি। মগবাজারের জ্যামে বসে আছি ঘন্টার পর ঘন্টা। এইতো চলে এসেছি।“ বলেই কেটে দিলো। কুট।

ফোন করে রুশা একটাও কথা বলবার সুযোগ পেলো না।

মগবাজারে এসে যাবিন দেখে রাজপথ একেবারে স্বাভাবিকের চাইতেও বেশী জনহীন।

ঢাকাবাসীর জন্য এটা একটা চরম অবিশ্বাস্য কাহিনি। তবে এ গল্প যতই মনরঞ্জক কিম্বা হাই টিআরপি মার্কাই হোক না কেনো রুশাকে বলা যাবে না। এখানে কাহিনিতে সেন্সরের কাঁচি চালাতে হবেই, নইলে যাবিনের এতক্ষণের বাহানার বিড়াল থোলে থেকে ঝাঁপিয়ে বেরিয়ে পড়বে।

‘বাহানা!‘

প্রায় ফাঁকা একটা দোতলা বাসের উপরের তলায় দুজনের বসবার একটা সিটে জানালা ঘেসে হাত-পা ছড়িয়ে বসে যাবিন একা। ঘাড় কাৎ করে পাবজি খেলছিল মোবাইলে। হঠাৎ জানালার বাইরে চোখ চলে যায় বিনা আগ্রহেই। চোখে পড়ে মগবাজারের বর্তমান প্রকৃত অবস্থা। করোনার সর্তকতায় লকডাইন আপাতত ক-দিন নেই। তবে স্কুল পাটশাল এখনো বন্ধ।

যাবিনের মাথায় বাহানা শব্দটা আসতেই ওর মুখ তেতো হয়ে ওঠে।

মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে দৃষ্টি বোলাচ্ছিল বাসের বাইরে। দোতলা বাসের উপরের তলায় বসার ভাবই আলাদা। চলন্ত বাসের বাইরে তাকালে মনে হয় মাটিতে থাকা লোকজন আর অন্যন্য সব কিছুর ওপর থেকে সে ভেসে যাচ্ছে। তবে ঐ বাহানা শব্দটা নিয়েই এখন তার মন চঞ্চল হয়ে ওঠে।

আজ থেকে ন-মাস আগেও রুশার সাথে দেখা করা বা কথা বলবার জন্যেই যাবিন বিভিন্ন ছল, ছুঁতো, বাহানা খুজতো।

যাহোক করে যাবিনের বিএ ফার্স্ট ইয়ার শেষ হতে না হতেই কোথা থেকে উড়ে এসে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তী হলো রুশা। ব্যাস যাবিনের এত দিনের বিরক্তিকর লেখা-পড়া, কলেজে আসা যাওয়া অতর্কিতে সব স্বপ্নপুরির মতো আকর্ষণীয় হয়ে উঠলো।

যেন সমুদ্রের সৈকতে কোনো এক সকালের সূর্যের আলোকে ঝিকি মিকি করে উঠেছে একটা মৎসকন্যা! হ্যা মৎসকন্যাই। ধরা ছোঁয়া সম্ভব নয়। শুধু দূর থেকে দেখাই যায়। প্রায় না-থাকবার মতই একটা নিদারুন অস্তিত্ব।

এমসিআই কলেজে প্রায় ছয় হাজার ছাত্র-ছাত্রী। এর মধ্যে সাড়ে চার হাজারই ছাত্র। একাদশ থেকে তিন বিভাগের ব্যাচেলার। দেড় হাজার ছাত্রীর মধ্যে রুশা সবার চোখে পড়ে গেলো প্রথম সপ্তাহতেই। যে সব ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্ররা নিয়মিত কলেজে আসাটাকে বোকামী বা ওয়েস্টেজ অফ টাইম মনে করতো, রুশার কথা শুনে তারাও কলেজে আসতে শুরু করে দেয় এক নজর দেখবার জন্যে। এগারো বারো ক্লাশের ডেপো ছেলেরা আপু আপু বলে আড্ডা মারবার চেষ্টা চালিয়ে যায়। মাস্টার গুলো চান্স ছাড়ে না।

যাবিন স্কুল ফাইনাল পাশ করেই এখানে। তিন বছর! এত দিনে এক ঘেয়ে লাগছিল জীবনটা। রুশার দেখা পেয়ে এবার স্বপ্ন দেখা শুরু হয়ে গেলো। আসলে এই মধ্যবিত্ত কলেজে এমন বিদেশি অবকাঠামোর বাঙ্গালী মেয়ে এর আগে ভর্তি হয় নি হয়তো। ঢাকা শহরেও বিরল।

রুশা; ঋজু-তন্বী, উচু-লম্বা, পটল-চেরা-চোখ, খাড়া নাক, দুধে আলতা গায়ের রং –এ সবই ওর অধিকারে।

প্রতিটা ছাত্রের রাতের স্বপ্নে ঘুরে বেড়ায় এই মেয়েটা। ওকে ভালো লাগে না এমন কথা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষই বলতে পারবে না। এমন কী কলেজের পাগলাটে শাবিও না।

শাবি কলেজের চরম পাগল ছেলে। আড়ালে সবাই ওকে পাগল বা ছিটিয়াল বলেই ডাকে; এমন কি স্যার ম্যাডামও। কারন শাবি বোর্ডে স্ট্যান্ড করা ছেলে, পড়া-শোনা আর শাবির মাঝখানে বাতাসটুকু ছাড়া আর কিছু নেই।

রুশা কলেজে ভর্তি হবার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই শাবি আর রুশাকে দেখা গেলো কলেজ ক্যান্টিনে বসে নুডুলস খাচ্ছে।

অতএব সবার চোখে শাবি এবার একেবারে যাদুগর হয়ে ওঠে। রুশাকে অনেকেই মনে করে খুব চালু মাল, বেছে বেছে জিনিয়াস ছেলেটাকেই ধরেছে।

মোট কথা কলেজের সবাই যখন রুশা-দর্শনে কৃপা-ধন্য হতে চায়, ঠিক তখনই একদিন অফ পিরিয়ডে শাবি রুশাকে নিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দিলো যাবিনের সাথে। রুশার দরকার ছিল একজন কম্পিউটার বোদ্ধালোক বা মাস্টার। ভেবেছিল শাবি নিশ্চয় খুব ভালো কম্পিউটার জানে। শাবি আর দেরী না করে রুশাকে নিয়ে আসে যাবিনের কাছে। কলেজে যাবিন ‘স্টিভ-গেটস‘ নামে খ্যাত ।

সেই থেকে শুরু। যাবিনের ভালো লাগতো ওর নীলচে চোখ জোড়া আর প্লাস্টিকের মত চকচকে উজ্জ্বল গায়ের রং।

শাজাহানপুর আমতলা মসজিদের গলিতে রুশাদের বাসায় গিয়ে গিয়ে কম্পিউটার শিক্ষিয়ে নিজেদের দিলু রোডের বাসায় ফিরতো প্রতি দিন। সকালে উঠেই কলেজ, সেখান থেকে দুজনে এক সাথে রিক্সায় শাজাহানপুর। কম্পিউটারের টিউশন।

কলেজে যাবিনের শত্রু তৈরি হয়ে গেলো অনেক, সেই সাথে যাবিনও একেবারে সর্বজন পরিচিত চেহারা বা যাকে বলে সেলিব্রেটি হয়ে উঠলো অল্প দিনের মধ্যেই।

রুশা, দু-বোনের মধ্যে বড়। মা চোখের ডাক্টার, বিকাল থেকে মধ্যবিত্ত এলাকার চশমার দোকানে চেম্বারে বসে। বোন সারা দিনে স্কুল আর টিউশন নিয়েই চব্বিশ-সাত ব্যাস্ত। বাবা সরকারী বদলির চাকরীতে সংসার নিয়ে ঢাকায় এসে গেঁথে বসেছে কেবল মাস সাতেক। সে ক্লান্ত বদনে ফিরে আসে সাতটার মধ্যেই।

প্রথম দিনেই এত সব জেনে নিয়ে যাবিনরীতিমতো নেচে উঠেছিল মনে মনে। ঠিক করে ফেললো অতি শান্তিতে নির্ঝঞ্ঝাট নিপাট প্রেম করা যাবে। এবং মনস্থি করেই ফেলেছিল এবারের প্রেমটাই হবে ওর জীবনের শেষ ও নিস্বার্থ প্রেম। কিন্তু সমস্যা হলো রুশা নিজে। ও এত বেশী অধ্যবসায়ী এবং মেধাবী যে মাসখানেকের মধ্যেই কম্পিউটারের নাড়ি নক্ষত্র সব শিখে ফেললো।

পরীক্ষা নেওয়ার জন্যে তো আর দিনের পর দিন আসা যায় না একজনের বাসায়। তবে সুবিধাও হলো মারাত্মক। ততদিনে দুজনের মধ্যে প্রেম জমে না উঠলেও ভালো বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়ে গেলো।

এমন কি কলেজ শেষে বাইরে কোথাও বসে গল্প গুজব করা যেতো অনায়াসে।

অতএব বন্ধু-বান্ধবেরা ডেটিং বললেও ওরা আসলে সময় কাটাতো ঢাকা শহরেরর এখানে সেখানে ঘুরে ঘুরে। তারপর হঠাৎই এক দিন তিন-দিন পর দেখা হয়ে দুজনই দুজনকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করে ফেলেছিল উত্তরার এক চাইনিজ রেস্তোরা কেবিনের আলো-আঁধারী মায়াতে। সে দিনই ওরা বুঝে উঠলো যে, না, ঘুরে বেড়ানো নয়, ওদের আসল উদ্দেশ্যই হলো ডেটিং করা।

সেই রাত যাবিন পৃথিবীর সব চাইতে ধনবান পুরুষ হিসাবে নিজেকে ভাবতে ভাবতেই ভোর করে ফেললো। তারপর দুজনে ঢাকার লোকালয়ে খুঁজে ফিরতে লাগলো একটু আড়াল, বন-বাদাড়, বিস্তির্ণ নির্জন মাঠ, অনর্থক মাঝ নদীতে স্থির নৌকার ঘের টোপ। মিরপুরের পেছনে,জলা-ভূমির ওপর নির্মিত ঘুপচি ঘরের হোটেল।

একান্ত বিরক্ত হয়ে কখনো সখনো রুশাদের বাসা। সন্ধ্যা অবধি সেখানে ভীষণ নিরাপদ।

কলেজে ওরা তখন নিরব শত্রুদের মাঝখানে বত্রিশ পাটি দাঁতের মধ্যে জ্বীহ্বা হয়ে বেঁচে আছে। এরপরই ঘোষণা হয়ে গেলো মার্চ বিশের সাধারন ছুটির। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কলেজ বন্ধ। সাধারন ছুটি –তাতে তো আর মন ছুটি নেয় না। দু-জনে দিনে দশ পনোবার কথাবার্তা হয় হোয়াটসআপ আর ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে, কিন্তু তাতে কিছুতেই তৃপ্ত হয় না দুটো মন। মাঝখানে মানুষ একটু বীর হয়ে উঠলো। সতর্কতাও কমলো। এক দিন রুশা জানালো, দুপুরে বাসায় চলে আসো একসাথে খাবো। অতএব মাক্স পরে যাবিন গিয়ে পৌছুলো রুশাদের পাড়ায়।

সুন্দরী মেয়েদের বাসার চারিপাশেই অনেক স্বেচ্ছাসেবী পাহারাদার এবং কাজে লাগার জন্য অপেক্ষমান কিছু যুবক থাকেই। উভয় পক্ষ একই যুবক, তবে স্বত্তা দুটো। এই দ্বিতীয় স্বত্তার সুযোগ গ্রহন করতে পারে সুন্দরী স্বয়ং আর তার মা-বাবা এবং প্রথম স্বত্তার যুবকরা পুলিশ কুকুরের মতো ক্ষিপ্র। সন্দেহজনক মনে হলেই গর গর করতে করতে ঘুরে ঘুরে শুঁকতে থাকে সন্দেহ ভাজনকে। আবার সেই সাথে পুলিশি জবাবদিহিও চালু রাখে।

এই প্রথম রুশা ছাড়া একা একা এ পাড়ায় এসেছে যাবিন। কোথা থেকে, কোন দোকানের কোনো কোণ থেকে বেরিয়ে আসলো প্রথম দলের একজন যুবক।

“কী এহানে কারে চান?“

যাবিন প্রথম প্রথম একটু ধাক্কা খেলেও সামলে উঠে প্রমান করে দিল যে ও ডাঃ সাবিহা সুলতানার বোনের ছেলে। খালা আসতে বলেছে বলে ও এসেছে দেখা করতে এই করোনাকালেও। সেই পাড়াতো মুরুব্বি জানতোই না ডাঃ সাবিহা সুলতানা সকালেই করোনা রুগীর সেবার উদ্দেশ্যে একটা এনজিওর কাজে সাত দিনের জন্যে চলে গিয়েছেন রাজশাহী।

যাবিনও জানতো না ব্যাপারটা। চার তলায় উঠে দেখে রুশাদের বাসা একেবারে ফাঁকা। ওর বাবা আঁধা বেলা অফিসে, মানে এখন আর পুরোটা সময় অফিস করতে হচ্ছে না। বোন অন-লাইনে ক্লাশ নিয়ে ত্রস্ত ও ব্যাস্ত।

সেদিনই, ফাঁকা ঘরে একজন যুবক আর যুবতী দীর্ঘ দিন অদেখা অধরা থেকে অভ্যাস বসে দুজনে চুম্বনের মধ্যে দিয়েই আবেগ প্রকাশ শুরু করেছিল, তবে তা ফলাফল গিয়ে দাঁড়ালো আদম-ঈভের নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের ফলে।

রুশা যেন আজ সব বাঁধা-বিঘ্ন জড়তা কোমলতা আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণে লাভার মতো নির্গত করে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে রইলো বিছানায়। দুজনের পৃথিবী নিস্তব্দ হয়ে মহাশূণ্যে স্থবির ভেসে বেড়াচ্ছে। কোনো তাড়া নেই, কোনো কাজ নেই, কোনো ভয় নেই কোনো সরম নেই। স্বপ্নের সদাগরীতে রুশা ভাসছে তেপান্তরে।

দুপুরের খাওয়া হয় নি তখনও। যবিন নিষ্পলক দৃষ্টিতে নির্মোহ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে প্রায় নগ্ন এলিয়ে পড়ে থাকা রুশার দিকে, ওমর অর্টিজের কোনো পেন্টিং দেখছে। চিত্র আর চিত্রকর দুজন মুখোমুখি। হঠাৎ দেখে বোঝবার উপায় নেই কোনটা মানুষ আর কোনটা ছবি।

যাবিনকে তার দিকে বুভুক্ষুর মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে এতক্ষণে নিজের নগ্নতায় নিজে লজ্জ্বা পায় রুশা। “কী দেখছো ওভাবে?“

যাবিন আস্তে ধীরে ঝুঁকে মাথা গুজে দেয় ওর বুকে। রুশা আঁকড়ে ধরে মাথাটা নজের বুকের মাঝখানে।

যাবিন জানতে চায়, “ কেউ এসে পড়বে না তো?“ পুরুষ মানুষের মন।

রুশা জানায়, “ঘরের দরজা বন্ধ। আর আব্বা আসলে বাইরের দরজার কলিংবেল বাজবে।“ কথাটুকু বলে রুশা একটা দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে। যাবিন বলে, “কী হলো?“

অসহায় ছড়িয়ে পড়া মুক্তার মালার মতো অতি মৃদু মিষ্টি কন্ঠে রুশা বলে ওঠে, “তুমি আমায় বিয়ে করবে তো?“

এ প্রশ্নের জন্য যাবিন মোটেই প্রস্তুত ছিল না। ও মাথা তুলে জানতে চায়, “এই করোনার মৌসুমে?“

রুশা গলা থেকে একটা শব্দ বের করে, “হুঁ!“

“তাহলে বাসর হবে কি মাস্ক পরে?“

“এইতো বাসার হয়ে গেলো।“

“বাসর দিনে হয় না। দিনে চুপি চুপি হয় ‘কেচ্ছা‘। আর ঢাক ঢোল পিটিয়ে রাতে একটা মেয়েকে সবার চোখের সামনে ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজায় খিল তুলে দেওয়াকেই বাসর বলে।“

বাস কখন এসে গেছে মৎস্য ভবনের স্টপেজে যাবিন টেরই পায় নি। যখন টের পেলো ততক্ষনে সিট ছেড়ে লাফিয়ে উঠে দো-তলা বাসের নিচ তলায় নামতে নামতে বাস আবারো চলতে শুরু করে দিয়েছে। শত কন্ঠের হৈ হৈ শুনতে শুনতে চলন্ত বাস থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে যাবিন।

আর একটু হলেই হয়তো পড়েই যেতো। পড়ুক আর না-ই পড়ুক, অকস্মাৎ এমন করে বসলে বুক ধড় ফড় করে উঠবেই। ঠিক সে সময় আবারও ফোনটা বেজে উঠলো। রুশার ফোন।

যাবিন ফোন ধরেই চিৎকার করে উঠে, “কী হলো কী। বলছিতো আসছি। আর একটু হলেই বাসের চাকার নিচে পড়তাম। চলে এসেছি।“

রুশা ভেবে পায় না, যাবিন আজকাল এমন রাফ ব্যবহার করছে কেনো!

যাবিন হেঁটে যেতে যেতে ভাবে, ‘মেয়েটা বিশ্ব সুন্দরী হতে পারতো তবে ভারি বিরক্তিকর। সেই যে সেদিনের পর থেকে বিয়ে বিয়ে করে মরছে।‘

জাতীয় নাট্যশালার পেছনে মাঠে আড্ডা মারার বিস্তর জায়গা। একপাশে কফি-হাউস। চেয়ার টেবিলের আয়োজন এখানে অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। ঘাসে ঘাসে দলে দলে চাপা স্বরে আলাচারিতা আর চা-চপ সিঙ্গাড়ার সমারোহ। মাঝারি গোছের জনসভা গড়ে উঠতে পারতো এই জনসংখ্যায়। তবে সবাই বিচ্ছিন্ন, নিজ নিজ সুখ দুঃখের মেজাজে মশগুল।

বিকেলের পর যুবক যুবতীদের সমবেত হওয়ার উত্তম ব্যবস্থ্যা। চারিদিকে পোশাকে আশাকে আভরনে বাংলার খাঁটি সংস্কৃতির ঝলক। দেখে মনে হবে বাংলা নাটক আর বাঙ্গালী সাহিত্য-চিত্রকলা ইত্যাদি নিয়েই সবাই ভারী চিন্তিত।

বিল্ডিংয়ের তলা থেকে বেরিয়ে মাঠে পৌছুতেই রুশা হাত তুলে ওর অবস্থান নিশ্চিত করে যাবিনের কাছে। আশে পাশের পুরুষা এতক্ষণ রুশাতে তক্কে তক্কে না দেখে আছে তেমন তো নয়। কারন ওর রূপ, অবয়ব। যারা ওকে চুপি চুপি দেখছিল এবার তাদের চোখ গিয়ে পড়লো যাবিনের ওপর। না, ছেলেটাকে দেখে মনেই হয় না বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে তার আদৌ কোনো মাথা ব্যাথা আছে।

যে কোনো যুবতী তবু এ-জায়গায় বিকেল বেলাটায় চলে, তবে এধরনের যুবকতো একেবারেই নয়। আরো বিশেষ করে রুশার মতো একজন অতীব সুন্দরী যুবতীর সাথে। এখানেও যাবিন অনেকের চোখে চক্ষুশূল। সব মনে মনে।

তবে কফি-হাউসের রতনের কাছে কাস্টমার হলেই হলো। তা সে বাংলার ধ্বজা তুলে ধরুক বা দশ-হাত দূরে সরে থাকুক।

রতন বারো চোদ্দ বছরের এক এছোড়ে-পাকা ছেলে। একাই মাঠ-ভরা কাস্টমার-লোকজনের ওয়ার্ডার সামাল দিয়ে যাচ্ছে। এখানে নিয়ম, যে যার খাবার কাউন্টারে টাকা দিয়ে নিজে নিয়ে আসবে। তাই রতনের উপর চাপটা কম। নিয়মিত যাদের যাতায়াত তারা রতনকেই ডেকে বলে যা চাই।

যাবিনরা এখানে প্রায় আসে। রুশাই জায়গাটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। রতন দুজনকেই নামে চেনে।

যাবিন একটু আগে চিৎকার করে কথা বলার জন্য এখন একটু লজ্জাষ্কর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গিয়েছে সামনা সামনি এসে। ও রুশার কাছে এসে ঝপ করে বসে পড়ে ঘাসের ওপর। মুখে মাস্ক এখানে সবার। যাবিনও মাস্ক পরে, মাথা নিচু করে বসে আছে রুশার সামনে। তার চেহারার কোনো ভাবমূর্তির আভাসও বোঝবার উপায় নেই এই মুহূর্তে।

যাবিনের ধারনা সুযোগ হলেই, তাকে হাসি খুশি দেখালেই রুশা সেই চর্বিত চর্বণ প্রশ্নটা তুলে ধরবে। ‘আমরা বিয়ে করছি কবে?‘ যাবিন রীতি মতো ভয়ে ভয়ে থাকে বিসিএস মৌখিক পরীক্ষার মতো।

রুশা নিজের মুখের ম্স্কটা খুলে ফেলে জানতে চায়, “কী হয়েছে, সোনা? শরীরটা ভালো আছেতো?“

করোনার প্রকোপের আগে শুধু বয়স্ক মানুষজনকে প্রশ্নটা করা যেতো, ‘কী শরীর ভালো তো?‘ মানে –এখনো কিছু দিন টিকে থাকা যাবে বলে মনে হচ্ছে?‘ আর আজকাল এই প্রশ্নটা করবার জন্য বয়সের কোনো বাদ বিচারের দরকার নেই। কেউ একটু কেশে উঠলে, হাঁচ্চি দিলে বা নাক টানলেই প্রশ্নটা করা একেবারে ফরজ। আর গাটা একটু আধটু গরম হলেতো আর কথাই নেই। সে তো প্রায় সমাজচূত -‘ভীক্ষু‘।

নিজের কৃতকর্মের লজ্জার হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য যাবিন মাথাটা না তুলেই উত্তর দিল, “কাল রাত থেকে শরীরটা বেশী ভালো না।“ ততক্ষনে রতনও ছুটে এসেছিল এক কাপ কফি নিয়ে। রতন জানে যাবিন এসেই কফি খাবে। সে তখনও হাত পাঁচেক দূরে। কথাটা তার কানেও গেলো। সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো নদী-মুখে নোঙ্গর ফেলা সমুদ্র-জাহাজের মতো। রুশা তড়ি ঘড়ি আবারো মাস্কটা পরে নিয়ে সামান্য সরে বসলো। জানতে চাইলো, “ টেষ্ট করিয়েছো?“

তখনো পৃথিবীর বড় বড় দেশ করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে আদা জল খেয়ে খেটে চলেছে দিবানিশি। অতএব শুধু টেষ্ট করা ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই।

যাবিন চট করে ভেবে নিলো, এভাবেই অন্তত মাস খানেক রেহাই পাওয়া যেতে পারে এই মেয়ের বিয়ের আগ্রহ থেকে। বলে দিল, “না, কাল সকালে যাবো।“

কথা শুনে রতনই প্রথম বলে ওঠে, “যাবিন স্যার, আপনি বাসায় যান গা, আমি একটা ওবার ধইরা লইয়া আহি।“

যাবিন কিছু বলে ওঠার আগেই রুশা রতনকে যাবিনের বাসার ঠিকানা বুঝিয়ে দিল। শিল্পকলা, নাট্যশালার আশে পাশেই কিছু উবার থাকেই। উবারের বাজারও আজকাল তেমন ভালো না। তাই উবার পাওয়া গেলো সহজেই।

রুশা জানতে চাইলো, “যেতে পারবেতো একা একা?“

উত্তরে যাবিন অতি নীচু স্বরে যা বললো তাতে কোনো অর্থ বেরিয়ে আসে নি। রুশা সেই ঘর ঘর শব্দ শুনেই বলে দিলো, “ আচ্ছা তাহলে যাও। বাসায় পৌছে ফোন দিও।“

পরের পাঁচ সাত দিন সকাল বিকাল হোয়াট্স-আপ। তারপর আর ফোন নেই। যাবিন ভাবলো, বাঁচা গেলো; অনর্থক আর অসুস্থ থাকবার ভান করতে হচ্ছে না।

তবে ফোন এলো ঠিক সপ্তাহ দুয়েক পর। হোয়াট্স আপ নয় ম্যাস্জঞ্জার নয় একেবারে কল। মোবাইলে নাম দেখলো, বুশ। যাবিন রুশার নম্বার বুশ নামেই সেভ করে রেখেছিল। মৃয়মান কন্ঠে যাবিন বললো, “ হ্যালো!“

ওপাশ থেকে কান্না ভেজা কন্ঠে ডাঃ সাবিহা সুলতানা বলে উঠলেন, “ কে, যাবিন?“

যাবিন বলে, “জী, বলছি।“

“বাবা, রুশা আর নেই।“

চলন্ত বাস থেকে কে যেন ধাক্কা মেরে ঠেলে ফেলে দিল যাবিনকে। স্পষ্ট পুরুষালী কন্ঠে যাবিন সে দিনের মতো চিৎকার করে ওঠে, “ নেই মানে?“

এখন আর ‘নেই‘ কথাটা অবাক হবার মতো কিছু নয়, তবু যাবিন নির্বাক হয়ে থাকলো কয়েক দিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ