একটা টেবিলের কথা - অচিন্ত্য দাস



-“আসব, স্যার?”

-“এস। তবে বেশিক্ষণ বকিও না”

-“না, না স্যার। আগেই তো বলেছি সংক্ষেপে একটা সাক্ষাৎকার, ব্যাস্। আপনার ত নিরানব্বই চলছে, আর ক মাসেই ত শতবর্ষ!” খাতা আর ফোন বার করে মেয়েটি বলল।

“ এখনই বোধহয় শতবর্ষ, ইসকুলে সকলেই এক-আধ বছর কম লেখাত, বাবাও নিশ্চয় তাই করেছিলেন।”

“ ঠিক আছে, তা ই ধরছি। আমার প্রথম প্রশ্ন – আপনার সুদীর্ঘ জীবনের কিছু পুরোনো ছবি কি এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে ?”

সুদর্শন বাবু একটু সময় নিলেন। তারপর দেয়াল ঘেঁষে রাখা মেহগিনি কাঠের টেবিলটার দিকে তাকিয়ে বললেন –“ পাঁচ-ছ বছর বয়সের কথা আবছা মনে পড়ে। এ ঘরে দাদামশায় থাকতেন। ওনার মারা যাওয়ার দিনটা আমার মনে নেই, তবে তারপর ঘটা করে ঘর পরিষ্কার করাটা মনে আছে।

“ ঘর পেলাম আমরা আর টেবিলটা পেলাম আমি। আমার ইস্কুলের খাতাবই থাকত। হাতের লেখা লিখতাম, মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে নামতা আর পদ্য মুখস্থ করতাম। দেরাজ মানে ড্রয়ারে সকলের চোখের আড়ালে রাখতাম আমার প্রাণের থেকে প্রিয় লাট্টু আর কাচের মার্বেল গুলো। একবার একটা ফড়িং ধরে রেখেছিলাম ড্রয়ারে। সঙ্গে দিয়েছিলাম বাতাসা আর বাটিতে একটু জল। কিন্তু ইস্কুল থেকে এসে দেখলাম মরে গেছে। কবেকার কথা, কিন্তু মরা ফড়িংএর ছবিটা মনে রয়ে গেছে ...। একটু বড় হতে ক্লাশের ডেঁপো ছেলেরা উল্টোপাল্টা বড়দের বই আনত, পড়তে দিত। তা লুকিয়ে রাখার জায়গাও ছিল ওই টেবিলের ড্রয়ার।

“ কলেজে উঠলাম। ... আচ্ছা এ জায়গাটা একটু কেটেছেঁটে লিখো... মেয়েটি পড়ত সকালের বিভাগে, আমদের ত দুপুরের ক্লাস। ভারি ভাল লাগত ওকে। মুখটা মনে নেই চোখটা আছে। নামটা জেনেছিলাম – বিশাখা। কী করে কাছে যাই, কী করে কথা বলি.. অনেকবার খসড়া করে শেষে একটা চিঠি লিখে ফেললাম। কিন্তু দেওয়া আর হয়ে ওঠেনি। মানে তখন ত আর এখনকার মত মেলামেশার সুযোগ ছিল না। চিঠিটা লুকিয়ে রেখেছিলাম টেবিলের দেরাজে মানে ড্রয়ারে..। মাঝেমাঝে একলা চুপিচুপি পড়তাম আর কেমন যেন একটা কষ্ট পেতাম, তবু পড়তাম। কলেজ পাশ করলাম, তার খবর আর জানতে পারিনি।

“ এদিকে দেরাজের চাবিটা কি করে যেন হারিয়ে গেল। কোথায় যে গেল।

“জ্যাঠামশায়ের খুঁটির জোর ছিল, আমাকে সওদাগরি আপিসে চাকরি করিয়ে দিল। উফ্, কি যে খাটাত। মালিক ভীষণ কড়া, আজকের কাজ আজকেই করতে হবে। পারতাম না। বাড়িতে খাতাপত্র নিয়ে এসে এই টেবিলে বসে রাত্তির একটা-দুটো অবধি কাজ করতাম। তারপর একদিন শানাই বাজল। ঘরে এলো অনুপমা।

“পুরোনো টেবিল অনুপমার পছন্দ ছিল না। ওর নিজের হাতে কুরুশের সুন্দর কাজ করা একটা টেবিল-ঢাকা পাতল। মাঝখানে পেতলের ফুলদানি। রোজ সকালে বাগান থেকে ফুল তুলে ফুলদানিতে রাখত। বাতাসে টেবিল-ঢাকাটা ঢেউএর মত এলোমেলো উড়ত, সঙ্গে ফুলের হালকা সুঘ্রাণ .. ওঃ, কি যে ভালো লাগতো। অনুপমাকে ভীষণ ভালবাসে ফেললাম, কিন্তু মাঝেমাঝে ভয় করত, ওর যা নজর – যদি চাবিটা খুঁজে পেয়ে যায়—বিশাখাকে লেখা চিঠি তো এখনো আছে সেখানে।

“ সেরকম চেষ্টা ও অবশ্য কখনো করেনি। কতদিন আমাদের সুখেদুঃখে একসঙ্গে কেটে গেছে তারপর। এই সাত বছর আগে এই আশ্বিনেই একদিন সে চলে গেল। টেবিল-ঢাকা আর নেই। ফুলদানিটা ওখানেই আছে, কালো হয়ে গেছে, ঝিকে কতবার বলেছি তেঁতুল দিয়ে মেজে রাখ – কথাই শোনে না।

মেয়েটি দেখল টেবিলে ওষুধপত্র, বাড়িতে রক্তচাপ মাপার যন্ত্রর পেছনে আছে বটে একটা ফুলদানি।

আর দু-চারটে কথার পর মেয়েটি উঠল। বলল “ খুব ভাল হয়েছে স্যার, দু-এক হপ্তার মধ্যে বেরিয়ে যাবে। আচ্ছা একটা কথা স্যার, সাক্ষাৎকারের শিরোনামটা আপনার নামেই হবে তো….”

মেয়েটি এবার একটু অবাক হলো। বুড়ো তো এতক্ষণ বেশ চটাপট জবাব দিচ্ছিল, হঠাৎ চুপ করে গেল কেন?

নিজের নামের কথা উঠতেই সুদর্শনবাবুর মনে কোথাথেকে একটা প্রশ্ন এসে ঘোরাফেরা করছিল। ভাবছিলেন – একশ পার হয়ে গেছে, আর কদিন! কটা মাস, বড়জোর একটা বছর। শরীরটা এখনো তেমন খারাপ হয়নি কিন্তু হতে কতক্ষণ। তা সে তো যেতেই হবে। তবে একশ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো নিজের নামটাই আসল? না কি মনে থেকে যাওয়া মুখগুলো? জীবনের মানফানে নিয়ে ভাবার মতো মানুষ তিনি নন তবু আজ হঠাৎ মনে হল – নাম, চেহারা, বয়স এসব তো সকলেরই একটা করে থাকে তাতে নিজের বলে কিছু নই। একান্তই নিজের সম্পত্তি বলে এখনো যদি কিছু থাকে তা হলো মনে রয়ে যাওয়া সময়ের টুকরোগুলো।

সুদর্শন বাবু পুরোনো টেবিলটার দিকে আর একবার তাকালেন। জিনিসটা যেন ভীষণ মন টানছে আজকে। এর ভেতর ধরা আছে ছেলেবেলার সেই লাট্টু আর মরা ফড়িং। জীবনের একটিমাত্র ছোট্ট গোপন কথাটিও আটকে আছে এখানে, চাবি অবশ্য হারিয়ে গেছে সেই কবে। কালো ছোপ পড়ে গেলেও ফুলদানিটা আছে এখনও। ফুল আর কে রাখবে এখন। তবু জানালা দিয়ে বাতাস এলে মনে হয় হালকা একটা সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে কোথা থেকে ... অনুপমার হাতের কাজ করা অদৃশ্য সেই টেবিল-ঢাকা ঢেউ এর মত এলোমেলো ওড়ে ..

আনমনে বললেন –“ না না বড় অক্ষরে আমার নাম লিখে আর কী হবে বল, শিরোনামে তুমি বরং লিখো – মেহগিনি কাঠের টেবিল”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. সত্যি ত নাম টা প্রায় ১০০ বছর বহন করে চলেও , সেই নামের বাহকের, সেই দীর্ঘ জীবনের টুকরো টুকরো সময় গুলো বন্দি হয়ে আছে ঐ টেবিলের দেরাজের মধ্যে, যা জীবনের বাঁচিয়ে রাখার রসদ জুগিয়েছে , তাই নামকরণের প্রকৃত মূলায়নের প্রথমেই ঐ মেহগনির টেবিল এর নাম টাই যথার্থ পরিপূরক হয়ে উঠেছে গল্পের নাম ও কর্ম ও কারকের প্রকৃত বিশ্লেষণ। আপনার প্রত্যেক গল্পের অন্তর্নিহিত ইংগিত এত সুন্দর ভাবে লুকিয়ে থাকে , সেটাই আপনার গল্পের নিজস্বতা আর পাঠক কে ধরে রাখার একটা প্রবল প্রচেষ্টা। দারুন , আজ ৭৫ বছর স্বাধীনতা উদযাপনের খুশিকে সত্যি প্রাণবন্ত করে রাখল।

    উত্তরমুছুন
  2. সত্যি ত নাম টা প্রায় ১০০ বছর বহন করে চলেও , সেই নামের বাহকের, দীর্ঘ জীবনের টুকরো টুকরো সময় গুলো বন্দি হয়ে আছে ঐ টেবিলের দেরাজের মধ্যে, যা জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার রসদ জুগিয়েছে , তাই নামকরণের প্রকৃত মূলায়নের প্রথমেই ঐ মেহগিনি কাঠের টেবিল এর নাম টাই যথার্থ পরিপূরক হয়ে উঠেছে গল্পের নাম ও কর্ম ও কারকের প্রকৃত বিশ্লেষণ। আপনার প্রত্যেক গল্পের অন্তর্নিহিত ইংগিত এত সুন্দর ভাবে লুকিয়ে থাকে , সেটাই আপনার গল্পের নিজস্বতা আর পাঠক কে ধরে রাখার একটা প্রবল আর অদ্ভুত কৌশল। দারুন , আজ ৭৫ বছর স্বাধীনতা উদযাপনের খুশিকে সত্যি প্রাণবন্ত করে রাখল।

    উত্তরমুছুন