মন্টো অশ্লীলতা ও কিছু কথা - ঋভু চট্টোপাধ্যায়


ল্যাটিন অবসকিনা(obscaena) থেকে আসা অবসিনিটি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ অশ্লীলতা অর্থে কোন কাজ বা উচ্চারণ যা সেই সময়কার নীতির পরিপন্থী। শব্দটি বেশ বিতর্কিত হলেও এর নির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। কারণ যে বিষয় এক জনের কাছে অশ্লীল তা অন্য জনের কাছে অশ্লীল নাও হতে পারে।একজন বিখ্যাত চিত্র শিল্পীকে ‘যৌনতা কি?’ এই ব্যাপারে প্রশ্ন করাতে উনি উত্তর দেন, ‘ধরুন একজন মহিলা সম্পূর্ণ বিবস্ত্রা হয়ে রাস্তায় যাচ্ছেন, এটা কিন্তু নগ্নতা, কিন্তু সেই একই মহিলা যখন কোন একটি কাপড়ের খণ্ড দিয়ে শরীরের কোন একটি অংশ আড়াল করবার চেষ্টা করেন তখন এটি যৌনতা।’ এখন প্রশ্ন সাহিত্যে যদি এই ধরনের কিছুর বর্ণনা করা হয় সেটিকে কি বলা হবে অশ্লীলতা না যৌনতা ?একটা কথা বলা হয় কোন বই বন্ধ করে দেওয়া মানেই একটা ভুল যুক্তির কাছে মাথা নিচু করে নেওয়া, একটা পচে যাওয়া সমাজের কাছে আত্মসমর্পণ করে নেওয়া।আমেরিকার অশ্লীলতা সর্ম্পকিত আইন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছবি ও সিনেমা সর্ম্পকিত, যদিও বইয়ের ব্যাপারে কিছু সেন্সারশিপ প্রযোজ্য, এবং যেটি মানুষের কাছে যা অশ্লীল বলে মনে হয় সেটাকে সাময়িক বা পুরোপুরি ভাবে বন্ধ করবার মধ্যে দিয়েই আমেরিকার সেন্সারশিপ প্রযোজ্য, যদিও আমেরিকাতে বাক্ স্বাধীনতা কিন্তু একটি অন্যতম প্রধান গনতান্ত্রিক স্তম্ভ। ‘obscenity only comes in when the mind despises and fears the body and the body hates and resists the mind.’ ১৯৬০ সালে পেঙ্গুইন পাবলিসারর্সকে তাদের একটি বই প্রকাশের জন্য কোর্টে উঠতে হয়, বইটির নাম ‘লেডি চ্যাটার্লির লাভার’ লেখক ডি.এইচ লরেন্স। বইটির বিষয় এক ধনী ব্যাক্তির স্ত্রী ও তাদের পরিবারের এক চাকরের সাথে প্রেম ও দেহজ মিলনের বিস্তারিত বর্ণনা।পরবর্তী কালে বইটিকে বাক্ স্বাধীনতা প্রকাশের একটি অন্যতম সেরা বই হিসাবে বলা হয়।প্রথম তিনমাসেই তিন লক্ষ কপি বই বিক্রি হয়। অবশ্য ১৯১৫ সালে তাঁর ‘রেনবো’ বইটিও ব্যান করা হয়, কারণ সেই অশ্লীলতা। ‘সনস অ্যাণ্ড লাভারস’ বইটির ক্ষেত্রেও নীতিবাগীশদের বিভিন্ন আক্রমণ হয়, আসলে আমরা একটা গতানুগতিক ধারণাতে বিশ্বাস করি সেখান থেকে সরলেই আমাদের চিন্তা শক্তিতে আঘাত পড়ে।

এগুলি সব পশ্চিম দেশের কথা। আমাদের বাংলাতে স্বাধীনতার আগে ও পরে অনেক সাহিত্যিকের রচনাকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হতে হয়। কিন্তু সব থেকে বেশি সমস্যার মুখে পড়তে হয় মন্টোকে। দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক সাদাত হোসেন মন্টোর জন্ম ১৯০২ সালের ১১ই মে, মৃত্যু ১৯৫৫ সালের ১৮ই জানুয়ারি। মন্টোর পূর্বপুরুষ কাশ্মীরের আসল বাসিন্দা হলেও মন্টোর জন্ম ভারতের লুধিয়ানাতে যদিও তাঁকে বিশ্ব সাহিত্যের অনেকে মূলত পাকিস্তানি লেখক হিসাবেই চেনে বা মনে রাখে, যদি ও সেই অর্থে কোন দেশই তাকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেয় নি, শুধুমাত্র তাঁর পঞ্চাশতম মৃত্যু বছরে একটা ডাক টিকিট প্রকাশ করে।মোট বাইশটি ছোট গল্পের সংকলন, একটি উপন্যাস ও অসংখ্য হিন্দি ও কিছু পাকিস্তানি ছবির চিত্রনাট্যকার মন্টো রেডিওর জন্যেও নাটক লিখেছেন।শিক্ষিত মুসলিম পরিবারের মানুষ মন্টোর সাহিত্যে ফরাসি ও রাশিয়ান সাহিত্যের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পাওয়া যায়।লেখাতে কিন্তু বরাবর সমাজের কঠোর ও কঠিন বাস্তবকে নিয়ে লেখার চেষ্টা করেছেন, যে বাস্তবকে নিয়ে অন্যান্য লেখকরা লিখতে সাহস পান না।তাই দেশভাগ, দাঙ্গা, আর তার পরিপ্রেক্ষিতে যে সামাজিক পরিবর্তন মন্টোর লেখাতে সেই সব বিষয় বার বার উঠে আসে।কিন্তু এর জন্য মন্টোকে মোট ছয়বার অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হতে হয়,ভারতে তিনবার এবং পাকিস্তানে তিন বার। ১৯৩৪ সাল থেকে বেশ কয়েক বছর মন্টো মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য স্ক্রিপ্ট লেখেন, সেই সময় কামাথিপুরার নিষিদ্ধ পল্লির কাছে বেশ কিছু মাস থাকতে আরম্ভ করেন।এই সময়, ঐ জায়গা, ওখানকার মানুষজন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।দেশ ভাগ তার লেখাতে বার বার উঠে আসে।অনিচ্ছা সত্বেও তাকে ভারত ছেড়ে মুহাজির হিসাবে পাকিস্তানে চলে যেতে হয়। পাকিস্তানের ‘পার্ক টি’ হাউসের থাকার সময় আহমেদ ফাইজ, নাসির কাজমি, আহমেদ রহি সহ আরো অনেক বিশিষ্ট লেখক ও বুদ্ধিজীবিদের সাথে তার আলাপ হয়।তার প্রথম গল্প ‘তামাশা’ ভারতে প্রকাশিত হয় এবং গল্পটি জালিয়ানওয়ালা বাগের ঘটনার ওপর লেখা।ঠিক এই সময় তাঁর লেখাতে মনস্তত্ব চেতনার পাশে বামপন্থী চেতনাও বার বার আসে।ইংরেজ লেখক লরেন্সের মত সমাজে এতদিন কার যে সব ঘটনা ট্যাবু হয়ে ছিল তাই বার বার তার লেখাতে আসে। যেহেতু ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশের সাথেই তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল তাই দুই দেশেরই সামাজিক বিভিন্ন ট্যাবু লেখাতে অনায়াসে স্থান পায়।একবার জহরলাল নেহেরুকে একটি চিঠিতে লেখেন, ‘যদি আপনি আমার লেখার মধ্যে কোন নোংরা কিছু পান, মনে করবেন সমাজটা সত্যিই নষ্ট হয়ে গেছে, কারণ আমি শুধুমাত্র সত্যিটাকেই তুলে ধরেছি।’ যেহেতু মন্টো ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশেই সমান ভাবে লিখে গেছেন দুই দেশেই সমান ভাবে জনপ্রিয় এবং অদ্ভুত ব্যাপার হল দুই দেশেই তার লেখা গল্প পরবর্তী কালে বিতর্কিত হয়েছে।১৯৪৭ সালের আগে ভারতে যে সমস্ত লেখা অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে তাদের মধ্যে, ‘ বু,’ ‘ধুয়ান,’ এবং ‘কালি সালোয়ার।’ আরো অদ্ভুত ব্যাপার হল দুই দেশেই মন্টো পিনাল কোর্ডের ২৯২ ধারাতে অভিযুক্ত হন।পাকিস্তানে তার গল্পের অশ্লীলতাতে অভিযুক্ত হওয়া ও তার বিচার প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল ও স্পর্শকাতর। যদিও মন্টো বার বার বলেছেন, ‘আমি পর্ণোগ্রাফার নয়, ছোট গল্পকার।’

১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি লোয়ার কোর্টে দেওয়া মন্টোর একটি ছোট গল্পের অশ্লীলতার বিপক্ষে বিচারকে চ্যালেঞ্জ করে বিপক্ষে রায় দেন, সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল গোলাম মহম্মদ ও সেডিয়াকেলের জুরি হেনরি ক্যাপটনের একটি উদ্ধৃতি স্মরণ করিয়ে বলেন, ‘that which is otherwise not lawful is made lawful by necessity.’ এই মামলাতে মন্টোর জেল না হলেও ফাইন হয়, যদিও মন্টো নিজে এই মামলার রায়টিকে তার নিজের mental imprisonment বা intellectual jailed ভাবেন।এই মামলার পরেই মন্টোর মানসিক রোগ দেখা দেয়, এবং পাঁচ মাসের মধ্যে তার মৃত্যু হয়।

সাংবাদিক আয়েশা জালাল মন্টোকে বলেন ‘বিপ্লবি’, যার প্রাথমিক কাজ হল সমাজের সব খারাপ দিকগুলো তুলে ধরা।তিনি বিশ্বাস করতেন সাহিত্যের মধ্য দিয়েই সমাজ নিজেকে দেখতে পাবে।সম্ভবত পাকিস্তানে মন্টোই প্রথম লেখক যিনি অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। ‘থাণ্ডা গোস্ত’,পাকিস্তানে মন্টোর পরিচিত ‘নাকোশ’ (naqoosh) ম্যাগাজিনের সম্পাদক আহমেদ নাদীম কাসমি প্রকাশ করতে অস্বীকার করে।পরে এই গল্পটি প্রকাশের জন্য পাঞ্জাব সরকার ম্যাগাজিন টিকে ছয়মাসের জন্য ব্যান করে দেয়, বিভিন্ন জায়গায় গল্পটির বিরুদ্ধে লেখাও হয়। আরেকটি ম্যাগাজিন Adb-i-Ltif এখানেও গল্পটিকে প্রকাশ করানোর চেষ্টা করা হয়, কিন্তু প্রুফ রিডিং এর পর গল্প ফেরত যায়।এর পর Naya Dau পত্রিকাতে মমতাজ সিরিন গল্পটি প্রকাশ করবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়, তাই প্রাথমিক ভাবে মন্টো গল্পটি কোথাও না ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীকালে সম্পাদক আরিফ আব্দুল মার্টিন তথা জাভেদ ম্যাগাজিনে এই গল্পটি প্রকাশ করেন ১৯৪৯ সালে।প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পত্রিকাটি পরিচিতি পায়, জনপ্রিয়তা ও অর্জন করে মন্টোর চিন্তা কাটে।ঘনিষ্ট মহলে বলেন, ‘যাক আর কোন চিন্তা নেই।’ কিন্তু পাকিস্তান সরকারের প্রেস ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে চৌধুরী মহম্মদ হোসেনের নেতৃত্বে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হয়।বাজার থেকে জোর করে ম্যাগাজিনের সমস্ত সংখ্যা তুলে নেওয়া হয়।কিছুদিন পরেই এই ম্যাগাজিন ও গল্প পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ পড়তে পারবে কিনা সে বিষয়ে বোর্ড গঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকরা সেই বোর্ডে থাকেন এবং কোন রকম সিদ্ধান্ত না নিতে পারবার জন্য পুরো বিষয়টি আদালতে যায়। খুব অল্পদিনের মধ্যেই পত্রিকার গোষ্ঠীর কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হয়। কোর্টে এই মামলার সাক্ষী হিসাবে যাদের ডাকা হয় তারা হলেন, কাশ্মীরের শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন ডিরেক্টর, খালিফা আব্দুল হাকিম, আহমেদ সাহিদ, লাহোরের ডয়াল সিং কলেজের মনোবিদ্যার প্রফেসর প্রভৃতি।এই কেস চলবার সময় একদিন একটা ভারি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। মন্টোর উকিল তাসাদ্দাক হোসেন উপস্থিত না থাকবার জন্যে মন্টো নিজেই একদিন সওয়াল করেন।আসলে মন্টোর গল্পের বিরুদ্ধে প্রধান যে অভিযোগ ছিল তা হল গল্পে অপবিত্রতার অতিরিক্ত ব্যবহার।যদিও এক উকিল ডক্টর সিজাউদ্দীন মন্টোকে ‘জীবনের চিত্রকর’ বলেন।একদিন মন্টোর কোর্টে উকিল উপস্থিত হতে পারেন নি, কিন্তু পরবর্তী কালে একদিন চার জন জুনিয়র উকিল মন্টোর হয়ে কোর্টে দাঁড়ায়।কিন্তু এত সবের পরেও মন্টোর জেল না হয়ে জরিমানা হয় ও অনাদায়ে আরো একুশ দিনের জেলের সাজা পায়।বাকি দুজন প্রকাশক ও সম্পাদকের জরিমানা হয়। তবে ১৯৫০ সালে এনায়েতুল্লা খান মন্টোর দেওয়া ফাইন ফিরিয়ে দেবার কথা বলেন। এই ট্রায়ালের ওপর মন্টোর নিজেরও লেখা বই আছে।যদিও মন্টোকে মুক্তি দেবার কিছু দিন পরেই পাঞ্জাবের সরকার আবার আপিল করে।

দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক মন্টোকে কোন দেশের কোন সরকারই সেই অর্থে কোন সম্মান দেয়নি। শুধুমাত্র তাঁর পঞ্চাশতম মৃত্যু বছরে একটা ডাক টিকিট প্রকাশ করে লেখা হয়, ‘পাকিস্তানের লেখক।’ শোনা যায় একবার সাহিত্যিক সমরেশ বসু গায়ক দেবব্রত বিশ্বাসের বাড়ি এসেছিলেন। কিন্তু দেবব্রত বিশ্বাস তাঁর সাথে কথা পর্যন্ত বলেন নি।যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয় উত্তরে দেবব্রতবাবু বলেন, ‘যে মানুষ ঐ রকম অশ্লীল গল্প লেখে তার সাথে কথা বলতে নেই।’ সমস্যা হল দেবব্রত বিশ্বাসের মত মানুষ ও সমরেশ বসুকে বুঝতে বা তাঁকে যথায়থ মূল্যায়ন করতে পারেন নি।আর আমাদের কাছে দুঃখের কথা হল আমরা কেও মন্টোকে মূল্যায়ন করতে পারিনি।মন্টোকে একবার প্রশ্ন করা হয়, ‘এই যে ভারত পাকিস্তান ভাগ হল, এত হিন্দু, এত মুসলমান মারা গেল আপনি কি ভাবে দেখছেন?’ উত্তরে মন্টো বলেন, ‘আমি দেখলাম এতজন মানুষ মারা গেল।’ আজকের এই অস্থির যুগে আমাদের বার বার করে মন্টোকে স্মরণ করতে হবে।বড় অদ্ভুত ব্যাপার হল,‘বাই দ্যা গ্রেস অফ আল্লাহ’ নামের একটি প্রবন্ধে তিনি কত দিন আগে অনুমান করেছিলেন, ‘একদিন সাহিত্য, শিল্পকলা সব সেনসারর্ড হয়ে যাবে।’


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ