বাউলবনের ছন্দ - সুদীপ ঘোষাল


সবাই তো দার্জিলিং,পুরী কিংবা দিঘা যায়। চল না নির্জন কোনো এক জায়গায়। যেখানে মানুষের ভিড় নেই। শান্ত সবুজের পরশ আছে। বললো দীপ।, অংশু বললো,চল যাওয়া যাক। কিন্তু সমমনস্ক আমরা দুজনে যাবো। কেনাকাটা করার লোকের সংখ্যা বেশি। তারপর আসল কাজ, ঘোরা, দেখা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দীপ বললো,ঠিক বলেছিস। তাহলে ঝালং ওঝান্ডি ঘুরে আসি চল। অংশু রাজী হলো।

তারপর সামান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ওরা বোলপুর থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ধরে চলে এলো নির্দিষ্ট জায়গায়। একটা হোটেলে উঠে মালপত্তর রেখে দিলো ওরা। কিছু হাল্কা খাওয়া দাওয়া করে বেরিয়ে পরলো বাইরে।

সুন্দর সবুজ পাহাড় দেখে মন জুড়িয়ে গেলো বল দীপ, অংশু বললো। দীপ দেখলো,সমান্তরাল পাহাড়ের শ্রেণী দিগন্ত ঘিরে রেখেছে। পাহারা দিচ্ছে সুন্দর বাগান।

মানুষের ভিড় খুব কম। তার ফলে নোংরা আবর্জনা কম। দীপ বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটছিলো। হঠাৎ একটা মেয়েকে দেখতে পেলো। পাহাড়ি, লোকাল মেয়ে। খুব সাহস। ভাঙ্গা বাংলায় বললো,এ বাবু। বেশি ভেতরে যাস লাই। লাফা জোঁক আছে। রক্ত চুষে লেবে। দীপ বললো,তাহলে তুমি এলে কেনো। তোমার ভয় করে না। মেয়েটি খিল খিল করে হেসে উঠলো। বললো,ভয় কি রে।আমাকেই সবাই ভয় করে। তারপর কোমর থেকে একটা ধারালো কুকরি বের করে দেখালো। বললো,এর ডগায় বিষ মেশানো আছে রে বাবু। একটু ছিঁড়ে দিলেই কাম ফতে।

দীপের মনে আছে একবার কোম্পানী ওকে ডমিনিকান রিওপাবলিক পাঠিয়েছিলো। কাজ সেরে ও গিয়েছিলো হিস্প্যানিওলা দ্বীপ। ওখানে নিয়ে যাবার জন্য লঞ্চ আছে। লঞ্চ তো নয়, ছোটোখাটো জাহাজ। ভূগোলে পড়েছিলো ও দ্বীপের দখলাতি নিয়ে স্পেন আর ফরাসীদের মধ্য লড়াই। কলহ হবে না কেন। গাইড ওদের বলেছিলো,এখানে মাটি খুব উর্বর

সাধারণত সামুদ্রিক মাটিতে দুর্লভ। তারপর যোগাযোগ ব্যাবস্থা সবই ভালো।

মানুষে মানুষে মিল দেখলেই ভারতবর্ষের কথা মনে পরে। কৃষিনির্ভর দেশ। পাশ্চাত্য দেশের রাস্তাঘাট, টেলি কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক,বিলাসবহুল রিসর্ট দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেছিলো দীপের। তবু ভারতবর্ষ, এক মন আনচান করার মোহময় দেশ। আনন্দময় দেশ।সেখানেও একটা সাহসী মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো।

আবার পাহাড়ি মেয়েটার কথায় চেতনা ফিরে এলো দীপের। বললো কি দেখছিস হাঁ করে বাবু। আমাকে না ওই পাহাড়কে। দীপ বললো,দুটোই।

মমে মনে ভাবলো,তোমার পাহাড় তো বাস্তবের পাহাড়কে হার মানিয়েছে। সাহস হলো না বলতে। কুকরি আছে। সাবধান। দীপ ভাবলো,মেয়েরা এখানকার সব চেনে। গাইড হিসাবে একেই নিতে হবে। অবশ্য মেয়েটি রাজী হলে তবেই।

দীপ বললো,আমাদের ঘুরিয়ে দেখাবি তোদের পাহাড়। আমার একটা বন্ধু আছে।

মেয়েটি বললো,আমার একদিনের মজুরি দিবি,তাহলে সব দেখাবো।

দেবো,দেবো নিশ্চয় দেবো।

আগে দে। গতবার এক হারামি পয়সা না দিয়ে পালিয়েছে।


দীপ একটা পাঁচশো টাকার নোট বার করে ওর হাতে দিলো। মেয়েটা হাসিমুখে একটা নমস্কার করলো। বললো,তু খুব ভালো। চ আমার সঙ্গে আয়।

দীপ আর অংশু ওর সঙ্গে গিয়ে দেখলো ওদের কাঠের বাড়ি। বুড়ো বাপ মেয়েটার রোজগারে খায়। খুব গরীব। এই গরীব মানুষগুলো ভারতের প্রাণ। বললো অংশু।বললো,এদের লাখ টাকা দিয়েও দেশ ছাড়াতে পারবি না। ওরা দেশকে হৃদয়ের এক অংশ মনে করে। দীপ বললো,এটা তোর পাকামির কথা। ভুগে মরবে তবু দেশ ছাড়বে না। তিন হাঁটুর এক মানুষকে দীপ বললো,আমার সঙ্গে যাবে। তোমার কোনো অভাব থাকবে না। লোকটি দুই হাঁটুর মাঝখান থেকে নেড়া মাথা তুলে বললো,তোর পয়সা তু রাখ,আমাকে আমার জাগায় থাকতে দে। মায়ের কোল ছেড়ে যাবো একবারে শ্যাষ দিনে। অংশু বললো,বেশি ঘাঁটাস না বোকাচোদা। ঝাড় খাবি।

মেয়েটা এবার সব জোগাড় করে ছাগলের দুধ দিয়ে চা বানিয়ে দিলো। দীপ আর অংশু খেলো

তারপর মেয়েটা ঝান্ডি পাহাড়ের আনাচে কানাচে ঘুরিয়ে আনলো। ঝালং এ ওরা বাস করে। খুব দূরে দূরে দুএকটি বাড়ি। ছবির মতো কোন শিল্পী এঁকেছেন কেউ জানে না। বললো অংশু।


সব ঘোরানোর পরে মেয়েটা বললো,রাতে কখন আসবি। বলে দে। আমার কাছে সোজা কতা। শরীল লিতে গেলে আরও টাকা লাগবে।



দীপ বললো,তার মানে। সে আবার কি। তু আমাদের সব দেখালি, পয়সা নিলি। তোর পরিশ্রমের হক্কের পাওনা। মনে রাখবি। তুই খুব ভালো। যা বাড়ি যা। শরীর চাই না। যা।

মেয়েটার চোখে জল। বলে সবাই আমার রূপ দেখে, মন দেখে না। তোর ভালো হবে।

এই বলে চলে গেলো। সেই রাতে দীপ ঘুমোতে পারলো না। শুধু পাহাড়ের ছবি জুড়ে সবুজ বরণ সাজ। মন পাগল করা সরলতা।

অংশু বললো,তুই প্রেমে পড়েছিস নাকি?কালকে রাতে ঘুমিয়েছিস তো?

চারদিন ওখানে থাকার পর ওরা আবার কলকাতা ফিরে এলো। দীপ বোলপুরে কাজ করে। কলকাতায় মেয়ে আর মেয়ের মা থাকে। মেয়ের মা বড়লোকের একমাত্র মেয়ে। ভালোবাসা কাকে বলে জানে না সে। দীপ ভাবে, হয়তো জিজ্ঞেস কর বে, ঘুরতে গেছিলে কেমন লাগলো। কিছু না। মেয়েটা এসে বললো,বাপি আমাদের এখানে একটা কাকু আসে মাঝে মাঝে। কে হয় আমাদের। দীপ সব জানে। ও বললো,আমাদের বাড়ি আসে মানেই আমাদের লোক। তোমার মায়ের বন্ধু। তুমি ভালো করে পড়বে। ওসব তোমাকে দেখতে হবে না মামণি।

দুদিন কলকাতা থেকে দীপ চলে গেলো বোলপুর কাজের জায়গায়। সারাদিন কাজ আর কাজ। বাড়ি ফিরে ও স্নান করে। মন আর শরীর দুটোই ফ্রেশ হয়। তারপর লেখা নিয়ে বসে। পড়াশুনা করে রাত বারোটা অবধি কোনো কোনো দিন। দীপ ভাবে, গ্রামে ও বড়ো হয়েছে। তুলি তখন দশম শ্রেণিতে পড়ে। দীপ তখন বারো ক্লাসে। একই স্কুলে পড়তো দুজনে। সাইকেলগুলো একটা ঘরে রাখতে হতো। দীপ সুযোগ বুঝে তুলিকে ডেকেছিলো। সেই ডাকে কি ভীষণ সারা তুলি যে দিয়েছিলে তা আজও মনে আছে দীপের। কেউ ছিলো না। টিফিনে মিড ডে মিল খেতে ব্যস্ত সবাই। তুলি তার তুলতুলে শরীরে শরীর ঘষে শিহরণ তুলেছিলো সারা শরীর জুড়ে

।দীপ ভাবে,যদি তুলির সঙ্গে নদীর ধারে কুটির বেঁধে বাস করতো তাকে বিয়ে করে তাহলে এক টুকরো আকাশের মালিক হতে পারতো। কিন্তু আর কোনো উপায় নেই। মেয়ে আছে। মেয়ের জন্য ত্যাগ স্বীকার তাকে করতেই হবে। মেয়ের মা তাকে ভালোবাসে না। তার কাছে কোনোদিন শোয় না। তাহলে মেয়েটা কার? কার সুখ আমি বয়ে নিয়ে বেড়াই নিশিদিন। দীপ ভাবে ছি ছি কি ভাবছে এসব। মেয়ের অকল্যাণ হবে না।

তারপর সুখেদুখে কেটে গেলো কুড়ি বছর। মেয়ের মা মারা গেছে। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। কোলকাতার বাড়িতে এখন জামাই আর মেয়ে থাকে। আর দীপ রিটায়ার্ড হওয়ার পরে বোলপুরেই থাকে।

একদিন দীপ শান্তিনিকাতনে ঘুরতে গেছে হেঁটে। এসময় হাঁটাহাঁটি শরীরের পক্ষে খুব ভালো। বয়স হয়েছে তো। দীপ হঠাৎ দেখলো একজন বিধবা মহিলা তার দিকেই এগিয়ে আসছেন। দীপ বিব্রত বোধ করছে। তিনি এসেই বললেন,এই যে আপনাকে বলছি,আপনি দীপ না? দীপ অবাক। আমার নাম জানেন কে আপনি?

------আমি তুলি, তোমার তুলি।
------তোমার তুলি! ও আমার হারিয়ে যাওয়া তুলি।
---- হ্যাঁ আমার এখানেই বিয়ে হয়েছিলো। ছেলেপিলে নেই। স্বামী মারা গেছেন। বাড়িতে আমি একা। তুমি কোথায় থাকো?
-----;আমি ভাড়া বাড়িতে থাকি।
-----ও কোলকাতায় থাকো না।
------না ওখানে মেয়ে থাকে। তার মা মরে গেছে অনেক আগেই।
------তা হলে এখন আমরা আবার আগের মতো হয়ে গেছি,সময়ের বিচারে।
-----কেন,আশীর্বাদ বলা যায় না?
------বলতে ভয় হয়। পোড়া কপাল আমার।
------সময় তো আশীর্বাদই করে,মানুষ তার যথাযথ সদব্যবহার করতে পারে না।


দীপ তুলিকে নিয়ে এখন কোথাও যেতে পারবে না। কারণ তুলি বিধবা । প্রথমে সঠিক একটা পরিচিতি বানাতেই হবে। তা না হলে মানুষ বিভিন্ন রকমের কথা বলবে। তাই একটা ভালো দিন দেখে ওরা বিদ্যাসাগরের ছবিতে প্রণাম জা নিয়ে কঙ্কালিতলায় বিয়েটা সেরে নিলো। তারপর নতুন একটা ঘর দেখে কীর্ণাহার শহরে ঘর ভাড়া করলো। সবাই নতুন বুড়োবুড়িকে বেশ হাসিমুখে বরণ করে নিলো।পূর্বকথা ওরা কেউ জানলো না। তুলির বাড়িটা বিক্রি করে অনেক টাকা পেয়েছে। ওরা ঠিক করলো,আর বাড়ি করবে না। কিছুদিনের মধ্যেই তো আপন বাড়িতে ফিরতে হবে। তাই তার আগে ভারতবর্ষের সমস্ত জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখবে। আর দীপ তার কলমে ফুটিয়ে তুলবে ভারতবর্ষের রূপ।


বাইরের ডাকে সাড়া দেবার আগে দীপ মেয়েকে মোবাইলে সব কথা জানালো। মেয়ে বাবার খুশিতে সুখী হলো। এবার দীপও তুলি বেরিয়ে পরলো আনন্দের সন্ধানে। ওরা চলে গেলো হিমালয়। কেদারনাথ,বদ্রিনারায়ণের পট খুলবে তৃতীয়ার দিন থেকে সাত দিনের মধ্যে।

হিমালয়ের পথে পথে কেদার, বদ্রি, উখিমঠ,তিঙ্গনাথ,চোপতা সব ঘোরা হলো দুজনের। পরের দিন সকালে হরিদ্বার থেকে গাড়িতে রওনা হয়ে পথে পথে দেবপ্রয়াগ। ভাগীরথী এবং অলকানন্দ বেশ কিছুটা পথ আলাদা ভাবে গিয়ে গঙ্গা নামে বয়ে চলেছে। বাণীপ্রসাদ গাইড। সে সব বুঝিয়ে চিনিয়ে দিচ্ছে।দীপ আর তুলি দুজনেই খাতা, পেন বের করে সব টুকে রাখছে। লেখার সময় কাজে আসবে,বললো তুলি। বাণীপ্রসাদজী বলে চলেছেন,আমাদের বাস কর্ণপ্রয়াগে চলে এসেছে। গাড়োয়ালে অলকানন্দার সঙ্গে কুমায়ুন থেকে বয়ে আসা পিন্ডার নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। রাতে পিপলকোটি হোটেলে আশ্রয় নিলো সবাই। মোট তিরিশজন যাত্রী আছে । কেউ গুজরাটি।কেউ মারাঠি কেউবা বিদেশী টুরিষ্ট। সারা পৃথিবীর মিলনমেলা। বাইরে বেরোলে মন বড়ো হয় বলো,বললো তুলি। দীপ বললো,এদের মাঝে এসে আর কোনো দুঃখ আমাদের কাহিল করতে পারবে না। জীবন শুধু সংসারে আবদ্ধ রাখলে হবে না। তুলি মাথা নেড়ে সায় দিলো। তারপর রাত কেটে গেলো । প্রভাতের আলোতে তুলি আর দীপ বন্দনা করলো জগদীশ্বরের। তারপর প্রাতরাশ সেরে ওরা বেরিয়ে পরলো যোশীমঠ হয়ে বিষ্ঞুপ্রয়াগ। তুলি বললো,এখানেই নারদমুনি ভগবানের বরে তাঁর অভিশপ্ত মানবজীবন থেকে মুক্তি পান।

গাইড এবার বললেন,আমরা বদ্রি নাথে এসে পরেছি।

সত্যযুগে শ্রীবিষ্ঞু এখানে পদার্পণ করেছিলেন। বিশাল কষ্টিপাথরের মূর্তি। দীপ বললো,চলো এবার দুপুরের খাবার খাওয়া যাক। তারপর বিকালের দিকে পায়ে হেঁটে ভারতবর্ষের শেষ গ্রাম মানাগ্রাম। মানাগ্রাম খুব ভালো লেগে গেলো তুলি ও দীপের। ওরা গাইডকে হোটেল ও খাওয়া খরচাবাবদ সমস্ত টাকা মিটিয়ে দিয়ে বললো,ভাই আমরা এখানেই থাকবো। আর কোথাও যাবো না। গাইড বললো,আপলোগকো বালবাচ্চা কিদার হ্যায়। দীপ বললো,হাম অর মেরে জানানা। অর কোই নেহি। গাইড বললো,হম আপকো লেড়কা মাফিক,আপ্লোগোকা খেয়াল রাখুঙ্গা। দীপ ওর কথা শুনে আরও পাঁচশো টাকা বখশিস দিলো। সে বললো,বাপকা দিয়া হুয়া আশীর্বাদ এহি রুপাইয়া। হম খরচা নহি করেঙ্গে। মেরা সাথ সাথ রহেগা। চোখের জলে বিদায়ের পালা শেষ হলো। তুলি আর দীপ মানাগ্রামে একটা ঘর নিলো। সামনেই বদ্রিনাথ। সকালে পুজো দেয়,প্রার্থনা করে। রান্না করার সবকিছু জোগাড় হয়েছে। কোনো অসুবিধা নাই। সামনে শ্মশান আছে। গাড়ি করে নিয়ে যায় এরা। কিছুটা দূরে সরস্বতি নদী পাহাড়ের ফাটল থেকে অলকানন্দা নাম নিয়ে বদ্রিনাথ মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে। মন খারাপ হলেই ওরা দুজনে সেখানে বসে। তুলি বলে, প্রকৃতির ভাষা পড়তে পারলে কোনো দুঃখ থাকে না। মানা গ্রামের কিছুটা দূরে চিনের বর্ডার।

এগ্রামের বৈশিষ্ট্য হলো প্রত্যেক পরিবারের কেউ না কেউ ভারতীয় সেনা বিভাগের কাজে যুক্ত।

ওখানে থাকাকালীন সকলের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেলো তুলি আর দীপের। ভাষা ওদের বাধা হয়নি। অল্প হিন্দী ভাষা এরা জানে। আবার ওদের কেউ কেউ বাংলা জানে।

হঠাৎ একদিন সেই গাইড এসে হাজির। সে বললো,মা কিছু বাংলা হামি জানি। হামি এখানে টুরিষ্ট আনলে একবার দেখা করে যাবে। তুলি বললো,নিশ্চয় আসবে বাবা।

দীপ ভালো মিষ্টি এনে পাতানো ছেলেকে খাওয়ালো।

তুলি এক নতুন বৌয়ের কাছে যায়। তার স্বামী বিয়ের পরে যুদ্ধে চলে গেছে। খুব চিন্তা। তুলি সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু একদিন খবর আসে তার স্বামী যুদ্ধে নিহত। কি মর্মান্তিক ভাষায় বর্ণনা কর যায় না, বললো দীপ। ওর শ্বাশুড়ি বললো,অপয়া মেয়েটা আমার ছেলেকে খেলো। ওকে ঘরে রাখবো না। শেষে তুলি তাকে তুলে আনলো মেয়ের পরিচয়ে। সে তাদের মেয়ে হয়ে আছে। খুব কম বয়স মেয়েটার। সতেরো বছরের রূপবতী মেয়ে। সবার লক্ষ্য তার দিকে। দীপ বললো,এর বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। মেয়েটার বাবা মা বললো,আপলোগ ব্যাবস্থা করে দিন। আমরা গরীব আদমী। তুলি বললো,ঠিক আছে, তাই হবে।

আবার একমাস পরে গাইড ছেলেটি এলে তুলি বললো, তোমার বিয়ে হয়নি? ছেলেটি বললো কে দেবে আমাকে লড়কী বলেন। দীপ বললো,তোমার মতো আমার একটা মেয়ে আছে। করবে বিয়ে। কিন্তু তার বিয়ে হয়েছিলো। স্বামী মারা গেছে।

গাইড বললো,করবো সাদী।

তারপর মেয়েটিকে দেখে গাইডের খুব পছন্দ। একদিন বাবা মা কে দেখিয়ে নিয়ে গেলো গ্রামের সবাই উপস্থিত থেকে ওদের বিয়ে দিয়ে দিলো।

আটদিন পরে যখন ওরা এলো খুব ভালো লাগছিলো তুলির। কি সুন্দর মানিয়েছে। ঠিক যেনো হরগৌরী। গ্রামের লোক সবাই ধন্য ধন্য করলো তুলি ও দীপের নামে। গ্রামের প্রিয়জন হয়ে গেলো ওরা। কিন্তু ওরা বাঁধা জীবনে আর থাকবে না।

কাউকে কিছু না জানিয়ে সমস্ত মায়া ছেড়ে তার আবার চললো অজানার সন্ধানে, পথে পথে...

এবার ওরা গেলো পুরী। জগন্নাথ দেবের দর্শন সেরে সমুদ্রের কাছে একটা ঘর ভাড়া করলো।

পরিচয় হলো শিবরূপের অসংখ্য মানুষের সঙ্গে। সমীর বলে একটি ছেলে একদিন বললো,দীপ দা একদিন আমার বাড়ি চলুন। দীপ বললো যাবো। তুলিকে দীপ বলছে, বুঝলে আজ সমীর বলে একটি ছেলের সাথে পরিচয় হলো। সে অনেক কথা বললো।তার কাছে শোনা কথা তোমাকে বলি শোনো।

সমীর সমুদ্রের কাছাকাছি একটি গ্রামে বাস করে । তার এক ছেলে ও এক মেয়ে ।স্ত্রী রমা খুব কাজের মহিলা । কাজের ফাঁকে গাছ লাগায় ছেলে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে । সমীর গ্রামে গিয়ে ছেলে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে গাছ লাগায়।আবার সময় পেলেই বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে অনেক অজানা তথ্য গ্রামবাসীদের শোনায়।

------- পরিবেশ বলতে কি বোঝায় গো অমর দা?একজন গ্রামবাসী জিজ্ঞাসা করলেন ।

-----সবুজ গাছপালা,জীবজন্তু,মানুষ নিয়েই পরিবেশ। আমাদের পৃথিবীর নানা দিকে বরফের পাহাড় আছে ।অতিরিক্ত গরমে এই বরফ গলে সমুদ্রের জল স্তর বাড়িয়ে দেবে ।ফলে সুনামী , বন্যায় পৃথিবীর সবকিছু সলিল সমাধি হয়ে যাবে । সবুজ পরিবেশ আমাদের বাঁচাতে পারে একমাত্র।
------তাহলে এর থেকে বাঁচার উপায় কি?
----মানুষকে প্রচুর গাছ লাগাতে হবে ।
------কি পদ্ধতি বলুন দাদা । কি করতে হবে আমাদের,সাধ্যমত করবো।
------এই যে পাখি ওপশুরা মল ত্যাগ করে বিভিন্ন স্থানে তার সঙ্গে গাছের বীজ থাকে ।এই বীজ গুলি থেকে বিভিন্ন গাছের চারা বেরোয় । বাবলা,গুয়ে বাবলা,নিম, বট,প্রভৃতি চারা প্রকৃতির বুকে অযাচিত ভাবেই বেড়ে ওঠে ।শিমূল গাছের বীজ উড়ে চলে আসে । একে আমরা বুড়ির সুতো বলি । তারপর বর্ষাকালে জল পেয়ে বেড়ে ওঠে ।
-----তাহলে আমাদের কাজ কি?
-------আমাদের কাজ হলও ওই চারা গুলি বড় করা ।তার জন্য আমাদের বাঁশের খাঁচা বানিয়ে ঢাকা দিতে হবে । পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ যদি এই নিয়মে মেনে গাছ লাগায় তবেই একমাত্র বিশ্ব উষ্ণায়নের কোপ থেকে রক্ষা পাবে ।

কিন্তু দুঃখের বিষয় মানুষের চেতনা এখনও হয়নি । গাছ কাটা এখনও অব্যাহত আছে ।তাইতো এত গরম ।বৃষ্টির দেখা নেই ।

অমর খুবই চিন্তার মধ্যে আছে । রাতে তার ঘুম হয়না । বর্ষাকাল চলছে ।সমুদ্র ফুলে উঠেছে আক্রোশে ।কি হয় ,কি হয় ।খুব ভয় ।

সমীর ভাবে,মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে বেইমানি করেছে । এর প্রতিশোধ প্রকৃতি নেবেই । তারপর অন্য কথা ।

একদিন বর্ষাকালে রাতে সবাই ঘুমিয়ে আছে কিন্তু জেগে আছে অমর আর সমুদ্রের বিষাক্ত ফণা । মাঝ রাতে সু না মীর একটা বড় ঢেউ এসে গ্রামের সবাই কে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ধ্বংসের পথে । এখন সেই গ্রাম শ্মশানের মত ফাঁকা ।

প্রকৃতি এখনও সুযোগ দিয়ে চলেছে বারে বারে । সাবধান হলে বাঁচবে । তা না হলে ধ্বংস অনিবার্য ।

দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে তুলি বললো, শত সহস্র অমরকে এগিয়ে আসতে হবে পৃথিবীর রক্ষাকর্তা হয়ে ।তবেইবাঁচবে আমাদের পৃথিবী।

দীপ বললো, বন্যার জলে সব কিছু সম্প্ত্তি ভেসে গেলেও অমর কিন্তু লড়াই করে বেঁচে আছে। সাঁতার কেটে শিশুপুত্রকে নিয়ে নিজেদের জীবন কোনোরকমে বাঁচিয়েছে।

তারপর দীপ ও তুলি গেলো অমরের বাড়ি। অমরের স্ত্রী তুলির সঙ্গে গল্প করছে। দীপ অমরকে কাছে পেয়ে বলতে শুরু করলো ছোটোবেলার কথা। দীপ বলছে,

আমরা ছোটোবেলায় মোবাইল পাই নি। কিন্তু আমরা যেসব আনন্দের অংশিদার ছিলাম সেসব আনন্দ এখনকার ছেলেরা আর পায় না। ইতিহাসের বাইরে চলে গেছে ভুলোলাগা বামুন।

ঠিক বলেছেন দাদা,আপনি বলুন। আমি শুনছি।

দীপ আবার বলতে শুরু করলো,জানো, তিনি ঝোলা হাতে মাথায় গামছা জড়িয়ে আসতেন শিল্পকর্ম দেখিয়ে রোজগার করতে। তিনি আমাদের বাড়িতে এসে শুরু করতেন নিজের কথা বা শিল্পকর্ম। নাটকের অভিনয়ের ভঙ্গিমায় বলতেন, আর বলো না বাবা। তোমাদের গ্রামে আসতে গিয়ে চলে গেলাম ভুলকুড়ি ভুল করে। তারপর মেলে, কোপা, বিল্বেশ্বর, চুরপুনি, সুড্ডো ঘুরে কোমডাঙ্গা। তারপর কেতুগ্রাম, কেউগুঁড়ি হয়ে গুড়ি গুড়ি পায়ে হেঁটে পোশলা, নঁগা, খাটুন্দি, পাঁচুন্দি হয়ে তৈপুর, পাড়গাঁ, বাকলসা, পাঁচুন্দি, মুরুন্দি, সেরান্দি,খাটুন্দি পার করে কাঁদরের গাবায় গাবায় হেঁটে এই তোমাদের গ্রামে।

আমরা জিজ্ঞেস করতাম, এতটা পথ হাঁটলে কি করে দাদু। তিনি বলতেন, সব ভূতের কারসাজি। তেনারা ভুলো লাগিয়ে দেন। ভর করে দেহে। তাই এতটা পথ হাঁটতে পারি। তারপর চালটা, কলাটা, মুলোটা দিতেন তার ঝোলায় আমার মা বা পিসি।

অমর আবার কবি। তাই আমার বাতেলা শুনতে ভালেবাসে।

কবিকে বললাম, তুমি তো জানো আমি রূপসী বাংলার রূপে ছুটে যাই। কিন্তু আমার চেনা পৃথিবীর সবটা হয়ে যায়

অচেনা বলয়,মাকড়সার জালের মতো জটিল । সবাই এত অচেনা অজানা রহস্য ময় ।বুকটা ধকধক করছে,হয়তো মরে যাবো, যাবো সুন্দরের কাছে,চিন্তার সুতো ছিঁড়ে কবির ফোন এলো । এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে, অভয়বাণী মিলেমিশে সৃষ্টি করলো আশা ।আর আমি একা নই,কবির ছায়া তাঁর মায়া আমাকে পথ দেখায়...

অমর বলে,দীপদা, আপনিও কবি। কি সুন্দর কথা বলেন।

দীপ বলে দেখো বিদেশের লোকরা নেচে নেচে খোল করতাল বাজিয়ে আমাদের মহাপ্রভু চৈতন্য দেবের নামগান করে। এই হলো ভারতবর্ষ।

অমর বলে,ঠিক,আমরা তার সম্মান রাখতে পারছি কই? দীপ বললো, শোন আমাদের পুজোবেলার কথা।

পুজো আসার আগে থেকেই বাড়িতে মা ও বাবা নানারকম মিষ্টান্ন তৈরি করতে শুরু করতেন। গুড়ের নারকোল খন্ড, চিনি মিশ্রিত নারকোল খন্ড, সিড়ির নাড়ু, গাঠিয়া প্রভৃতি। গুড়ের মিষ্টির ব্যতিক্রমি গন্ধে সারা বাড়ি ম ম করতো। আমরা স্বতঃস্ফুর্ত অনুভূতিতে বুঝে যেতাম পুজোর দেরি নেই। পুজোর কটা দিন শুধু খাওয়া আর খাওয়া। বাড়িতে যারা যাওয়া আসা করতেন তারাও পুঁটুলি বেঁধে নিয়ে যেতেন চিড়ি,মুড়কি, মিষ্টি মায়ের অনুরোধে ও ভালোবাসায়।

এখন গুড়ের মিষ্টি, ছানার মিষ্টির তুলনায় ব্রাত্য। কিনলে সবই পাওয়া যায়, ভালোবাসা মাখানো তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?

আমি বহু জায়গায় ঘুরে ঘুরে বাস করি রেল স্টেশনের ধারেই আমার তখন বাসস্থান । অই পাড়ায় আমি পনেরো বছর ছিলাম । সকালের দৃশ্য বড়ো মনোহর । শহরের মহিলা পুরুষ সকলেই একসাথে প্রাতঃভ্রমণে ব্যস্ত । সবুজের নির্মল হাওয়ায় মন হারিয়ে যায় সুন্দর হাওয়ায় । তারপর সারাদিন স্টেশনের ব্যস্ততার সময় । ঠিক গোধূলির আলোয় আবার মানুষের মন হারানোর পালা । চুপিচুপি অন্ধকার রূপের আদরে আশাতীত ভালোলাগার পসরা সাজায় প্ল্যাটফর্ম ।হারিয়ে যাওয়ার আনন্দে আলোকের গোপন ঈশারা,তোমার অন্ধকার ভোগের শেষে । অন্ধকারের মূল্য অসাধারণ । আলোর স্পর্শে ভালোলাগার কারণ এই আঁধার ।

আঁধার কালো, কালো সুন্দর, অকৃত্রিম আনন্দের সাজি সাজায় কালো । এইসব চিন্তা করতে করতে রাত নামে । আলো জ্বালিয়ে বুড়োদের তাসখেলার আসর শেষ হয়। সমস্ত প্রবীণ অভিমান তারা ঝেরে ফেলে ঝরঝরে নবীন মনে বাড়ি ফেরেন তারা ।

গল্প করতে করতে কখন যে রাত হয়ে গেছে বুঝতে পারেনি দীপ।

বৌমা বললো,আজ রাতে আপনারা আমাদের বাড়িতে থাকুন। আজ যেতে দেবো না।

তুলি আর দীপ এদের নিয়ে বেশ সুখে আছে। ঈশ্বর দর্শন ওদের মানুষের মাঝেই হয়ে গেছে।

রাত জেগে ওরা ঠিক করেছে, আগামীকাল ওরা আবার অন্যস্থানে ঘুরতে যাবে। কিন্তু ওরা অন্য কাউকে তাদের গোপন কথা বলে না।

দশদিন অমর দীপদার দেখা পায় নি। তাই একবার ওদের বাসা বাড়িতে দেখা করতে গেলো। বাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলো,দীপ দাদা কোথায় গেছে।

বাড়িওয়ালা বললো,বড় ভালো মানুষ পেয়েছিলাম গো। আমাকে এক মাসের পয়সা বেশি দিয়ে চলে গেছে।

অমর বললো কোথায় গেছেন বলতে পারবেন।

-----না, বাবা। ওরা বললো আমাদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। সব সাধু লোক গো। সংসারে কে যে কোন রূপে থাকে চেনা যায় না বাবা। এই বলে হাতটা কপালে ঠেকালেন।

অমর মাথা নীচু করে বাড়ি ফিরে চললো।

সে ভাবে, দিবারাতি নিজেকে ঠকিয়ে কোন ঠিকানায় ঠাঁই হবে আমি সর্বস্য মানুষের ।নিজেকে নিজের প্রশ্ন কুরে কুরে কবর দেয় আমার অন্তরের গোপন স্বপ্ন । জানি রাত শেষ হলেই ভোরের পাখিদের আনাগোনা আরম্ভ হয় খোলা আকাশে । আমার টোনা মাসিকে টোন কেটে অনেকে অভিশাপ দিতো । আমি দেখেছি ধৈর্য্য কাকে বলে । আজ কালের কাঠগোড়ায় তিনি রাজলক্ষ্মী প্রমাণিত হয়েছেন । কালের বিচারক কোনোদিন ঘুষ খান না । তাই তাঁর বিচারের আশায় দিন গোনে শিশুর শব, সব অবিচার ,অনাচার কড়ায় গন্ডায় বুঝে নেবে আগামী পৃথিবীর ভাবি শিশু প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি। অপেক্ষায় প্রহর গোনে নিজের অন্তরের প্রদীপ শিখা জ্বালিয়ে । সাবধান খুনীর দল ,একবার হলেও অন্তত নিজের সন্তানের জন্য শান্ত পৃথিবী রেখে যা । ঋতু পরিবর্তন কিন্তু তোর হত্যালীলায় বন্ধ হবে না নির্বোধ ।শান্ত হোক হত্যার শাণিত তরবারি ।নেমে আসুক শান্তির অবিরল ধারা। রক্ত রঙের রাত শেষে আলো রঙের নতুন পৃথিবী আগামী অঙ্কুরের অপেক্ষায়।

তারপর সংসারের টানা পোড়েন।রাগ,হিংসা,ক্রোধের সংমিশ্রণে সংসার স্রোতে ভাসতে ভাসতে জীবন প্রবাহ এগিয়ে চলে। হয়তো এর ফলেই দাদুর শেষজীবনে সেবার সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা। আমি নিয়ম করে দাদুকে গীতাপাঠ করে শোনাতাম। দাদু কত গল্প বলতেন। কোনোদিন হা পিত্যেশ করতে দেখিনি। আমার সময় কাটতো দাদুর কাছেই বেশি। পড়াশোনার ফাঁকে চলতো গীতাপাঠ। আমি জিজ্ঞেস করতাম,দাদু মরণের পরে আমরা কোথায় যাই? দাদু বলতরন,জানি না ভাই। তবে।।মরণের পরে যদি যোগাযোগ করা যায়,তাহলে আমি তোকে নিশ্চয় জানাবো। দাদু বলতেন, আমি যখন শেষ বিছানায় শোবো,তখন আমি ঈশারা করবো হাত নেড়ে। তখন তুই গীতার কর্মযোগ অধ্যায় পড়ে শোনাবি। তোর মঙ্গল হবে। আমিও শান্তিতে যেতে পারবো। হয়েছিলো তাই। কর্মযোগ পাঠ করা শেষ হতেই দাদুর হাত মাটিতে ধপাস করে পরে গেলো। দাদু ওপাড়ে চলে গেলেন হেলতে দুলতে চারজনের কাঁধে চেপে। মাথাটা দুই বাঁশের ফাঁক গলে বেরিয়ে ঝুলছিলো। আমি বলে উঠলাম, ওগো দাঁড়াও দাদুর লাগবে। মাথাটা ঠিক কর বালিশে দি। কেঁধো বললেন,মরে গেয়েচে। ছেড়ে দে। আমি বললাম, না ঠিক করো। তারপর ঠিক করলো দাদাভাই,দাদুর মাথাটা বালিশে দিয়ে।

আমি ভাবতে শুরু করলাম,মৃত্যু কি জীবনের আনন্দ কেড়ে নিতে পারে? পারে না।

সব কিছুর মাঝেই ঋতুজুড়ে আনন্দের পসরা সাজাতে ভোলে না প্রকৃতি। সংসারের মাঝেও সাধু লোকের অভাব নেই। তারা মানুষকে ভালোবাসেন বলেই জগৎ সুন্দর আকাশ মোহময়ী, বলেন আমার মা। সব কিছুর মাঝেও সকলের আনন্দে সকলের মন মেতে ওঠে। সকলকে নিয়ে একসাথে জীবন কাটানোর মহান আদর্শে আমার দেশই আদর্শ।

সত্য শিব সুন্দরের আলো আমার দেশ থেকেই সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করুক।

আমি বললাম, এক নাগাড়ে বকে গেলি অনেকক্ষণ। বন্ধু বললো, তুমি আরও কিছু বলো। সেই জন্যই তোমার কাছে আসা। আমি আবার বলতে শুরু করলাম,আমার কথা আমার গোপন কথা। আমার অনুভবের কথা। কবি বন্ধু আমার কথা শুনতে ভালোবাসে। সে সংসারী। তবু সব কিছু সামলে তার কবিতা ত লিখে চলে। আমি বন্ধুকে বলতে শুরু করলাম শরত জীবনের কথা।



শিউলি শরতের ঘ্রাণে শিহরিত শরীর। শিউলি নামের শিউলি কুড়োনো মেয়েটি আমার শৈশব ফিরিয়ে দেয়।

মনে পড়ে পিসির বাড়ির শিউলি গাছটার তলায় অপেক্ষা করতো ঝরা ফুলের দল। সে জানত ফুল ঝরে গেলেও

তার কদর হয় ভাবি প্রজন্মের হাতে । সে আমাদের ফুল জীবনের পাঠ শেখায়। মানুষও একদিন ফুলের মত ঝরে যায়। । শুধু সুন্দর হৃদয় ফুলের কদর হয়। শিমূল ফুলের মত রূপ সর্বস্ব মানুষের নয়। শরত আমাদের তাই শিউলি উপহার দেয় শিমূল নয়।

শিউলি ফুল তোলার পরে আমাকে দিত। শরতের মেঘ। হঠাৎ বৃষ্টি।।

আমার মনে পড়লো মাধবী আমাকে বৃষ্টির একটা বর্ণনা লিখে পাঠিয়েছিলো। সে বলেছিলো, তুমি তো লেখালেখি করো। আমার লেখাটা পড়ো। সে লিখেছিলো, বর্ষার কথা।

ঝরে চলেছে অবিশ্রান্ত। রাস্তায় বর্ষাতি ঢাকা প্রেমঋতুর আনন্দ বরিষণ বাড়িয়ে চলেছে উদ্দাম বৃষ্টির গতি । আনন্দে সে ভাসিয়ে চলেছে খাল বিল নদীর প্রসারিত কামদেশ। এখন ভাসাতে ব্যস্ত । তার সময় মাত্র দুই মাস । তারপর তাকে ময়দান ছাড়তে হবে । তাই সে নিজেকে উজার করে ঢেলে সাজাতে চায় ভিজাতে চায় শুকিয়ে যাওয়া ফুরিয়ে যাওয়া হৃদয় ।মাঝে মাঝে খেয়ালের বশে এত বেশি উচ্ছল হয় বর্ষাহৃদয় যে নদীর ধারা উপচে পড়ে ঘটায় অনর্থ । বন্যারাণী আবেগের ধারায় ভাসিয়ে দেয় গ্রাম শহরের সভ্যতা । মানুষের প্রতি রাগ যেনো ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে । মানুষ তবু শিক্ষা পায় কি ?কিছু অর্বাচিন গাছ কেটে সাহারাকে ডেকে আনতে চায় । কিছু মানুষ প্রকৃতির গতি হাতের মুঠোয় বন্দী করতে চায় । ফল হয় বিপরীত ।

অমর পৃথিবীর মানুষকে বলতে চায় তার অন্তরের কথা।

এসো বন্ধু আমরা সবাই বর্ষাহৃদয়ে ভিজি। যতদিন বাঁচি ভিজি,আনন্দ করি,বৃষ্টির সাথে খেলা করি। তারপর আমরা সকলে মিলিত হবো শেষ সম্মেলনে ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে। সেখানে কি খুঁজে পাবো এই বৃষ্টিহৃদয়?


এইসব ভাবতে ভাবতে সে পথের সন্ধান পেলো। পথ চলাই জীবন। এখনও তাকে চলতে হবে অনেক অজানা আকাশের পথ। তারপর শুরু হবে সোনার ধানের মরশুমে নতুন ভোর...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ