বাঁকের সন্ধান - দিব্যেন্দু নাথ

লিখেছেন  দিব্যেন্দু নাথ
(এক)

সিলেটি ক্যাম্প ছেড়ে গাড়ি পূর্ব অভিমুখে এগোচ্ছে। তখনও সমতলের ঘরবাড়ির ঘেঁষে ঘেঁষে। যাচ্ছে জৈথাং পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। পাকাধানের আগ্রাসনে হেমন্তর মাঠ। ডানে রাস্তা রেখে ছোট্ট জৈথাং দুহিতা নেমে আসছে আঁকাবাঁকা পথ ধরে। এই সময়ে নদীর বড়ো দুর্দশা। জল কম নুড়িবালিতে ভরা। বিয়ান টপকানো জৈথাং কোনওক্রমে শুকনো স্তনের নির্যাস ধারায় রসালো রেখেছে সূতোর মতো 'বারিকনালে'। তবে বর্ষার ধূসররঙা  শুকনো পলির দাগে আর স্রোতের আঘাতপ্রাপ্ত ক্ষত, কুলে দেখে বুঝা যায় এককালে যে ছিল সে তেজস্বীনি ও প্রভাবশালী নারী। এই অসহায় সময়েও সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়নি। এখনও উৎসের ধারায় চলার গতি রেখেছে জাগ্রত। পণ রেখেছে থামবার কোনও অবকাশ নেই, যেতেই হবে তাকেই গন্তব্যে। শত বাধা উপেক্ষা করে তার কোনও এক মোড়ের পাড়ে, প্রায় ভূমিহীন অবস্থায় আজও একটি কদম গাছ টিকে আছে অজ্ঞাত কারণে। ফুটে যাওয়া ফুলের সুবাসিত গন্ধ এখনও রঞ্জিত তার প্রাপ্তবয়স্ক পাতাগুলি। হেলে পড়া ডালের তলার মেঠো পথে গেলে, এখনও নাকেমুখে দুয়েক ঝাটকা মারে তার আমোদিত রঞ্জন-সুবাসে। জুলির বরের গাড়ি কদমতলায় আসতেই হঠাত্ চলন্ত ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। ড্রাইভার নেমে বর্নাট তুলতেই ধোঁয়ার ভরে গেল পথ। বাঁশরিয়াকে নামতে বলে, তাড়াহুড়ো করে বর জুয়েলকে নিয়ে নামল জুলি। ইতস্তত হয়ে ড্রাইভার বলল, 
-ম্যাডাম গাড়ি সারাই না করে, ইঞ্জিন আর স্টার্ট করা যাবে না। রেডিওটর লিক হয়ে সব জল পড়ে গেছে। 

সিদ্ধান্ত হল ড্রাইভার রেডিওটর সারাতে শহরে যাবে। পরন্ত বেলায় ফেরা সম্ভব নয়। কাল নতুন রেডিওটর নিয়ে ফিরবে। অনতিদূরে জুয়েলের এক বাঙালি কলিকের বাড়ি। বিয়ের নেমন্তন্ন পেয়েও যেতে পারেনি। জুয়েল দুঃখিত ছিল। তবুও বিপদে পড়ে ফোন করে জানিয়ে দিল, 'আজ তারা নব দম্পতি রাত্রি যাপন করবে বন্ধু বাড়ি'। আর সঙ্গে আসা অপাংশু, যাকে জুয়েল জানে, হাতুড়ে ডাক্তার শ্বশুর, বছরখানকে আগে এক স্মৃতিভ্রম নামহীন পাগলকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে সুস্থ করছেন বনাজী চিকিত্সায়। সে ভালো বাঁশি বাজাতে জানে বলেই তার নাম রেখেছেন  বাঁশরিয়া। জুলিকে খুব মানে। গির্জায় বিবাহ সম্পন্ন হতেই সে বায়না ধরেছিল,  জুলির সঙ্গে তার শ্বশুরবাড়ি আসবে। ভালোই হল। এই সংকটাপন্ন সময়ে গাড়িকে পাহারা দেবে রাতভর।


সূর্য চলে যাচ্ছে আড়ালে। তার লাল আগুনে তকতকে জ্বলছে পশ্চিম আকাশ। যেন প্রলম্বিত কোনো পাহাড়ে আগ্ন্যুপাত  অবদারিত। পাখিরা আর্তনাদে কোলাহল করছে গাছে গাছে। কদম ডালে একটি দলছুট ময়না। সবেমাত্র হামাগুড়ি ছেড়ে ওড়াল শিখেছে। মায়ের মানা সত্বেও সবার সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছে নতুন পৃথিবী দেখতে। পশ্চিমাকাশের ভয়াবহ আগুন দেখে সঙ্গীরা তাকে ফেলেই চলে গেছে। কাতরে ডাকছে সে, এ-ডাল ছেড়ে ও-ডালে গিয়ে। নশ্য অভিযানে নেমে আসছে আঁধার রাজ্য। বাঁশরিয়ার মতো ময়নাও সঙ্গিহীন আজ। সে হয়তো কাল আবার ফিরে পাবে সাথীদের! তাদের সমাজে ত বাঁশুরিয়ার সমাজের মতো কৃত্রিম জটিলতা নেই। 

ক্ষীণধারায় বহতা নদীর পারে দাঁড়িয়ে আছে নধর কদম। তার শাখায় প্রতিধ্বনিত হয়ে ময়নার আর্তনাদ ছুটে যাচ্ছে, সমতল ভূমি বিচরণ করতে। কুয়াশায় ভেজা সোনালি ধানের শিসে হেলান দিয়ে সুর ছুটছে, পাড়া গাঁয়ের তুলসী তলা ডিঙিয়ে উঠোনে। তারপর বড় ঘর, বসার ঘর, শোয়ার ঘর ভিজিয়ে রান্না ঘরের উনুনে। এই গুঞ্জন সন্ধ্যায় জ্বলে ওঠা রাইয়ের প্রদীপ শিখায়ও আঁচড় কেটেছিল। 

যার ঘর কিছুক্ষণ আগে আলোকিত হয়েছিল নব দম্পতির ছোঁয়ায়। স্বামীর মুখে খ্রিস্টান বন্ধুর পরিচয় পেয়েও মনে-মনে ইতস্তত বোধ করে কৃত্রিম হাসিতে সেরে ছিল আপ্যায়ন। অতিথি উজ্জ্বল বাড়িতেও প্রকট বাঁশির গুঞ্জ রাইয়ের চিত্তকে বিচলিত করে রেখেছে। গ্রামের বাড়ি হলেও আধুনিক প্রাচুর্যে ভরা তার আবরণ।   

বৈঠকখানায় দু বন্ধুর মদিরা জলসা। ভরে উঠল আবেগের তাড়নায় ফেলে আসা দিনগুলির স্মৃতি। দামি চকচকে স্ট্যান্ড লাগা কাঁচের গ্লাসে বরফ টুকরো ঢেলে ঢেলে চুমুকের পর চুমুক চলল, স্নিগ্ধ সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের উল্লাসে। সিক্ত 'পেক' গুলি ওরা পাংশু মুখে গিলছে দেখেও রাই কিছু বলেনি। কিন্তু নব বধূ স্বামীকে ইশারায় সাবধান করেছে, অত্যাধিক মদিরা নেশা যেন, নব-ঘোরলাগা আঁধার নেশায় ময়না-টিয়া'র মিলনে বিঘ্ন না ঘটায়। 

দখিনা জানালায় উঠে আসছে নদীর ঢেউ। সুমধুর সুরে হেমন্তর বাতাসের ভাঁজে। জ্যোস্না-স্নাত রাতে অপোয়া বাঁশির সুর সকলের পুঞ্জিভূত ব্যথাকে পুলকিত করলেও রাইকে আহত করছে অহরহ। আবাঞ্ছিত সুরেলা বাঁশির গুঞ্জন যেন সে বহুদিন পর শুনছে। এর কম্পন যেন খুব পরিচিত তার। বহুদিন আগে কেউ এই সুমধুর সুর দিয়েই তাকে আহত করে কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে। শেষবারের মতো এই সুর বেজেছিল, তার সাত পাকে বাঁধা রাতে। তবে এখনও, দূর থেকে কখনও কখনও এই গুঞ্জ আবছা ভাবে ভেসে আসে তার ককলিয়ায়।

(দুই)

যত সময় যাচ্ছে গুঞ্জ যেন আজ আরো স্পষ্ট হচ্ছে। এক অজানা মাদকতা রাইয়ের রান্না ঘরে ভুগছে। সুরেলা বাঁশি বলছে, '-হায় রে পোড়া বাঁশি, রইতে দিল না ঘরেতে'। 
  
এরই মধ্যে কদম তলায় কত কি হয়ে গেল! পাখি আর মানুষ পরস্পর বিরোধী হলেও 
দলছুট ময়না আর সঙ্গীহীন বাঁশরিয়া এক হয়ে রাত কাটাচ্ছে তিরতিরে বয়ে যাওয়া এক সুন্দরী নদীর পাশে। এত কালো রাতে প্রাণী দুটিকে পরস্পরের ভরসা করে দিয়েছে কদমই। তাতে কিছু ক্ষতি হল? - না। বরং নিষক কালো রাতের প্রহরের পর প্রহর এক ডোরে আবদ্ধ হতে চলেছে....

বাঁশরিয়া হাতের বাঁশি ঠোঁটে চাপতেই সুর তুলল বেদনার। "বনোমালী গো তুমি পর জনমে হইয়ো রাধা, আমি মরিয়া হইবো শ্রীনন্দের নন্দন তোমাকে বানাবো রাধা..."। কেউ যেন ডালে বসে বেদনাভরা সুরের ধূয়া দিচ্ছে.... ধূয়া সুরটি, অবাক হয়ে শুনছে বাঁশরিয়া। ময়না যেকোনো প্রাণীর স্বর হুবহু নকল করতে পারে। এইটুকু ছোট্ট বাচ্চা, এত বড় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছে কিনা?  সন্দেহ ছিল বাঁশরিয়ার। 

ছোট নদীর ছোট-ছোট বাতাসের ঢেউ, কদম ডালে ডিগবাজি খেয়ে বাঁশির সুরে তাল মিলিয়ে আছড়ে পড়ছে অগ্গায়নের জোছনা ভেজা পাকা ধানের মাঠে। রাতের গভীরতার সঙ্গে সুরের মিষ্টতা উজ্জ্বল হতে লাগল। খেঁচর গুলিও স্তব্ধ হয়ে গেল সুরের মাদকতায়। বেড়ে যেতে লাগল রাইয়ের উদ্বিগ্নতা। বারবার তাকে ফিরে নিয়ে যাচ্ছে, ফেলে আসা বাঁকের সন্ধানে। চাইলেও সে আর ফিরতে পারে না, জানে।  তবুও কেন জানি! কুণ্ঠিত করে তুলছে তার বিবেক বুদ্ধি। মনে হচ্ছে, দ্বাপরে রাধা কর্তৃক প্রাপ্ত অভিশাপ মোচন করতে কৃষ্ণ ঠাকুর সেজেছে এ জন্মে অপাংশু। ডালের বাঁশি যেন তার কৃষ্ণছায়া বিবেক। আর এই কলিযুগের রাই-ই যেন ছিল, দ্বাপরের রাধা।

অন্ধকার বাড়তে লাগল সকলের উদ্ভাসিত হারানো ব্যথা নিয়ে। রাইয়ের চোখের জলে ভিজে গেল সুখের বালিশ। আর ময়না-টিয়া নব মাদকতায় আচ্ছন্ন রইল আঁধারের গা ঘেষে.....। নতুন রেডিওটর নিয়ে আসা ভোরের অপেক্ষায়.....।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ