অবেলায় - দিব্যেন্দু নাথ

লিখেছেন  দিব্যেন্দু নাথ

(এক)

গাড়ি থামিয়েই বিমল হকচকিয়ে বলল,
- চলতা কাকা-না! এখানে যে?'
- কপাল রে বিমল।
- চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন বুঝি?
- না রে। অবসর দিয়েছে সরকার, আর নাকি কাজের উপযুক্ত নই। ছেলে-মেয়েও তাদের সংসারে বোঝা ভেবে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করল। তাই-
- কবে গেলেন অবসরে?
- ভাণ্ডারীমায় তোর কেসটা লিখে কাগজ ছিড়ে ফেলার ছ'মাস পর। সেদিনও বিমল দেখেছিল, খাকি পোশাকের কাঁধে দুটো উজ্জ্বল তারা, কাকার সেই আগেকারই বিক্রম সিংহের দাপট প্রকাশ করছিল। 

কার্তিকের সংক্রান্তিতে মা চালতা পাতায়  সোনালি ক্ষেতে, ধানকে সাধ খাওয়াতেন। বিমলরা চালতা পাতা কুড়োতে যেত ছোট বেলায়, কাকার সোনাগাছির বাড়িতে। পাতার সঙ্গে গাছের ডালও আনত ভেঙে। কচিকাঁচাদের ছোঁয়া পেয়ে ছোট্ট গাছটি, বেদনা চেপে দাঁড়িয়ে থাকত অজানা উল্লাসে। তখন কাকা তেড়ে আসতেন সিংহের মতো গর্জন করে। ওরা, কাকার আদুরে গাছের ভাঙা ডাল নিয়ে হাসতে-হাসতে দৌঁড়াত।

বিমল এখন আর ছোট্ট নয়। কণ্ঠে পুরুষালি স্বর। দাড়ি গোঁফে এক ট্রাক ড্রাইভার। ভাণ্ডারীমার পথে, দারোগাবাবুকে চিনতে পেরেই কথা বলছে। মেয়াদ উত্তীর্ণ গাড়ির পলিউশনের কাগজ নিয়ে। কাকা মোটেই চিনতে পারছিলেন না। তাঁর সোনাগাছির ছেলে বড় বিমলকে। পরিচয় পেতেই কেস না নিয়ে তার বাবার কুশল জিগ্যেস করলেন 
- দু মাস হল, বাবা মারা গেছেন। আপনি কি বাড়িতে যান না? -বিমল বলল।
- তোর কাকিমণির শেষকৃত্য করে এসে, ছ'মাস হল!  আর যাওয়া হয়নি।
- কুন্দনদা কেমন আছে?
- জানি না, যে ছেলের মা মারা গেল, মাত্র কুড়ি কিলোমিটার দূরে থেকেও শ্রাদ্ধের দিন আসার সময় হয়, তার সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখার ইচ্ছে নেই। 
- আর মৃণালদি?
- তোর কাকিমণির অসুস্থ অবস্থায় তিন মাস, ও-ই দেখাশোনা করেছে। কিন্তু মারা যাওয়ার চারদিনের মাথায় চলে গেল। আর কুন্দন রাগের মাথায় চলে গেল, মায়ের নোঁয়াটা না পেয়ে শ্রাদ্ধের দিন বিকেলবেলা।
- নোঁয়াটা বুঝি চুরি হয়েছিল?
- আমারও তাই ছিল মনে। কিন্তু সপ্তাহখানেক আগে মৃণালের জামাই বর্ডার থেকে ছুটিতে এল। সে ফোন করে জানাল, নোঁয়াটা নাকি মৃণালের কাছে। একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে আবার জিগ্যেস করলেন, 
- তোদের বিষয় সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে?
- হে। আমি এখনও কিছু আনি-নি!
- কেন?
- তোমার বৌমা বছরখানেক হল পুলিশের চাকরি পেয়েছে। বর্তমানে উত্তর ত্রিপুরার হেড কোয়ার্টারে। এত দূর থেকে আমিও মা-কে তেমন দেখাশোনা করতে পারছিনা, দাদা-ই সব করছে। কাকা আজ আর দেরি করতে পারছি না। সন্ধ্যার আগেই নামতে হবে, পাহাড়ে আজকাল যা সন্ত্রাস চলছে।

আজ আবার দু'বছর পর চাল নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে আসায় কাকার সঙ্গে দেখা।


(দুই)

আবার প্রশ্ন, 
- কুন্দনদার সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা নেই? 
- অবসর নেওয়ার পর উঠে ছিলাম তার ভাড়া করা ফ্ল্যাটেই। পুরোনবাড়ির মায়ায় মাঝে মাঝে যেতাম। তোর কাকিমণি আর কুন্দন মৃণালের শৈশব স্মৃতি মাখতে। হঠাৎ একদিন কুন্দন বলল, তার ফ্ল্যাটটা বিক্রি হচ্ছে। টাকার জুগাড় নেই, রাখার বড়ো ইচ্ছে। আমি ভাবলাম, আমার প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকা! ওদের জন্যই ত!.... 

দু মাস গত হতেই কুন্দন আর বৌমার মধ্যে ভীষণ ঝগড়া, নতুন গাড়ি কেনা নিয়ে। আমার ওইসব ভালো লাগছিল না। চলে এলাম মেয়ের বাড়ি। দুদিনের মাথায় মৃণালের কাছে ফোন! কুন্দন আসছে দলিলটা নিতে বাড়ি বন্ধক দেবে। ওর হাউজিং লোনটা আটকে আছে  কি একটা ঝামেলায়। 
- কুন্দনদার বউ এমন! -উৎকণ্ঠায় বিমল বলল।
- নিজের রক্তেই খুঁত! পরের মেয়েকে দোষ-বো কেন! 
- মৃণালদি!
- এতে মৃণালেরও হাত ছিল। মাসখানেক পর একদিন পুরোনো বাড়িটার জন্য মন ছটফট করতে লাগল। সেদিনটা ছিল তোর কাকিমণির মৃত্যু বার্ষিকী। গেলাম। দেখতে পেলাম, রাজমিস্ত্রি পুরনো ঘরগুলি ভেঙে নতুন বিল্ডিংএর কাজ করছে, তোর কাকিমণির সমাধিটাকে পরিত্যক্ত করে। বলেই দু চোখ বন্ধ করে নিলেন দারোগাবাবু। বিমল স্পষ্ট  দেখতে পাচ্ছে; কাকিমণির উজ্জ্বল ছবিটা গিজগিজ করেছে তরল আকারে। অধরা সুখ পাখিটা আবার ধরা দিয়েছে কাকার। চোখ বুঁজে রইলেন অনেকক্ষণ। ধীরে ধীরে চোখ খুলছেন, যেন পাখিটা উড়াল না দেয়। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পারলেন না। নিজেকে সংবরণ করতে, শতবার হেরে যাচ্ছেন। তাঁর উদাস চাহনি, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে আলোড়িত করে যাচ্ছে, এক অর্বাচীন আলোর উৎস। এবারে একটু ইতস্তত করে বললেন 
- ওরা আমাকে চিনতে পারল না। জিগ্যেস করতে বলল, তোদের পাশের বাড়ির
হারানবাবু বাড়িটা কিনেছেন।
- লোকটার আর কিছুতেই ভরে উঠল না। একটা বিতৃষ্ণা নিয়ে বিমল বলল।
- ওকে দোষ দিয়ে কি হবে! ফিরে মেয়ের ওখানে আবার উঠলাম। মৃণালকে বলতেই 'বলল'
- বাবা তুমি আর কদিনের? দাদার সংসারটা দাদাকে সাজাতে দাও। তাকে কিছু বলার আর কুন্দনের সঙ্গে দেখা করার কোনো ইচ্ছে রইল না। 

এমন ইমোশনাল ব্ল্যাকমিল!  চালিতাগাছ সহ তাদের মায়ের স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটাই বিক্রি করে দিল। আগে করে নিল সুকৌশলে প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকা শুণ্য। আমি যেন পরিত্যক্ত হয়ে গেলাম তাদের সংসারে। 

এখন পেনশনটাই ভরসা। যা পাই! একটি ঘর ভাড়া করে আলাদা থাকতে পারতাম! কিন্তু থাকি নি। একাকীত্বের ভয়ে। তাছাড়া ক্ষয়িষ্ণু অঙ্গ গুলি যে ভাবে সঙ্গ ছাড়ছে। কে আমার দেখভাল করবে! মনটা বড়ো অসহায় বোধ করত। তাই বেইমানিতে ভরা আপন রক্ত ছেড়ে, চলে এলাম শিলিগুড়ির এই আপনঘরে। এখানে ত আমারই মতো স্বজনহারা, অনেকগুলি মানুষের ঠিকানা। পেনশন অর্ধেকটা কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেই, প্রয়োজন হলে কিছু চেয়ে নেই। আর বাকিটা ব্যাঙ্কে জমা রাখছি, কুন্দন আর মৃণালের ছেলে দুটোর নামে। আমার অবর্তমানে, ওদের প্রয়োজন হলে নেবে! না হলে এখানে দান করে যাবে ......। চোখের কোণ মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে পা বাড়ালেন ভেতরের দিকে, চালতা কাকা। আর বলে গেলেন, 
-খুব মনে পড়ে-রে! কে জানে, কেমন আছে ওরা...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ