ফাউ ভরা অঞ্জনা - দিব্যেন্দু নাথ


লিখেছেন : দিব্যেন্দু নাথ
বাংলা ভাগের পর সিলেটীরা যেখানে যেখানে গিয়েছে। তাদের কিছু কিছু সংস্কৃতিও গেছে সঙ্গে। শ্রাদ্ধ বাসরের যম কীর্তন। তাঁদের একটি অন্যতম সংস্কৃতি। আসলে হয়, কৃষ্ণের গোষ্ঠ কীর্তন। গায়ক-বাদক সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নর্তক ভঙ্গিতে কীর্তন করেন। মণ্ডলী হয়, পরপর আভ্যন্তরীণ দুটি সারিতে। পরস্পর উল্টো দিকে পাঁক দেন। বাইরের সারি বড় বড় কাঁসর-করতাল আর গায়কের সমন্বয়ে। ভেতরে উল্টো পাঁকের সারিতে, তিন থেকে সাতটি খোল বাজে নৃত্যের পেখম আর ধা ধিন্ ধিন্ বুলিতে। কীর্তনীয়া গুনে গুনে সাবধানে পা ফেলতে হয়। বাদ্যের ঝাঁঝালো হুংকারে সুললিত গানের ছন্দ মিলিয়ে যায় মুহুর্তে মুহুর্তে। কেঁপে উঠে মাটি, বুক। মনে হয় উঠোনেই অদৃশ্য যম দোয়ার। বিষ্ণুর তুমুল যুদ্ধে কম্পিত। প্রদীপের পাশে কুণ্ডলি পাকিয়ে উঠে ধূপতির ধোঁয়া। দিনের আলোয় প্রদীপ শিখা ম্লান হলে, ধোঁয়াশায় ভরে যায় আঙিনা মন। নেড়া মাথায় তাঁর ছেলে! ভাতের পিণ্ডিতে তিল তুলসি দেয়। কুশাসনে বসে পুরোহিতের বলা মন্ত্র জপে-জপে।
বঁলরাম সিলেটির ছেলেও দিচ্ছে। সাদা মার্কিন গায়ে, ডান কাঁধে নূতন গামছা রেখে, কানে সাদা ফুল, হাতে কুশপাতার গয়না। পিতৃদশা থেকে মুক্তি দিতে, মাও বসেছেন ছেলের কাছে থান কাপড়ে। ছেলের মতো তেল-সাবান ছাড়া এগারো দিন ধরে মা। তবে মুণ্ড চাঁচর নয়। আধপাকা এলোমেলো চুল ভরা। মাড় মাখা খসখসে ঘোমটা বারবার খসে পড়ে মাথার। বড় বেমানান লাগে মাকে।

চোখ দুটো যেন সাদার ভীড়ে আরো বেশি লাল। চলে গেছেন স্বামী, ফাঁকি দিয়ে।  পঞ্চাশ বছরের সঙ্গী ছিলো। তাঁর সিদুরের মতো মধুরে ভরা ঝগড়া আর প্রীতি আড়াল হয়ে গেছে চিরতরে। 'মানুষটা সবকিছুতেই নির্ভীক ছিল। পরোপকারে আজীবন কেঁদেছেন নীরবে। আজও যেন টের পাওয়া যাচ্ছে। নিভৃতে তাঁর উপস্থিত।
স্বজনের ভাবলেশহীন চোখে। বিধবা মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে তাঁরই মেয়ে। যাকে একদিন বাবা, সম্প্রদান করেছিলেন করো হাতে। এখন সে! বাবার মতো পাকা এক খোল-বাদকের জননী। তার ছেলের হাতের ঠুনকি, অঙ্গভঙ্গি অবিকল দাদুর মতোন। আশ্চর্য হচ্ছেন উপস্থিত সবাই। নাতিই যেন বাদক দাদুর জীবন্ত স্মৃতি। পুত্র দেখে পিতৃ তন্ময়ে,  অবিরত মেয়েটা ভেসে যাচ্ছে সজলে।
আরেক জনেরও বুক ফাটছে! এসব না দেখেই। জন্ম দেয়নি বলে সে কি তাঁর মেয়ে নয়।
- না। তাঁর পুত্রবধূ। শ্বশুর তন্ময়ে সে আঁখিজলে ভাসছে, নার্সিংহোমের বিছানায়। গতকাল স্বামী পাঠিয়েছে। গ্যাসের ব্যথাকে প্রসব যন্ত্রণা ধরে। ছোটবেলায় বাপ হারিয়ে বাপের ছবিই ভুলে গেছিল অভাগী অঞ্জনা। তবে  শ্বশুর পেয়ে! বাবার অভাব অনেকটাই পূরণ হয়েছিল। কিন্তু আজ....!!!
একদিন দায়িত্ববান শ্বশুর বলেছিলেন, বৌমার ভাঙা স্বাস্থ্য দেখে। 'সমাজে ত ছেলেমেয়ের সমান গুরুত্ব'। কিন্তু বংশের বাতির জন্য, দুই নাতনি রেখেও নাতির হাত চেয়েছিলেন তার শাশুড়ি। ধেয়ে আসা কুসংস্কারের তুমুল ঝড়, বঁলরাম সিলেটির স্ত্রীকে আর সরিয়ে আনতে পারল না। মায়ের অটল সিদ্ধান্তে ছেলেও নিশ্চুপ! বউটাকে আবার ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর মুখে....।

বদহজমের ওষুধ দিতেই ব্যথা প্রশমিত। ডাক্তার বলে দিয়েছে, 'আরো দু মাস বাকি'.....!
সন্ধ্যা হওয়ার এখনো দু দণ্ড বাকি। এক টুকরো পড়ন্ত আলো, নার্সিংহোমের কাঁচে ধাক্কা দিল। প্রতিসরণে আলো ম্লান হয়ে ভেসে গেল ভেতরে। প্রয়াত শ্বশুরের একঝাঁক মায়া, গিজগিজ করে উঠল  হতভাগীর বয়ে যাওয়া চোখে। না বলা ফাউ, উপচে পড়ে টনটন বুকে।
-'কেউ কি  আসবে? আমাকে নিতে.....।
14-03-19

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ