গোলাইস দিদি - দিব্যেন্দু নাথ

লিখেছেন  দিব্যেন্দু নাথ


       ঝিনঝিনাঝিনি, খরানপোকার ডাকে দুপুরের প্রখরতা আরো বেড়ে গেল। হাল ছেড়ে এসে, ছেলের নামে নালিশ শুনে আজও আবার রেগে বলছেন 'অলুক্ষণে  গাছটা, না কেটে ছাড়বোই না। পঁচিশোর্ধে  হল, এখনো একটা ফল দিতে পারেনি। শুধু ছেলেপুলেগুলো চড়ে! আর বিবাদ ডেকে আনে।
   - না রেবা, কটিস না। ঔ মাত্র এগু-গাছ রইল, তোর বাপোর রোঁয়া। হক্কল-টাইনউ  কাটিলাইচছ, ঘরদোয়ার বানাইতায় করি -মা বললেন।
এতকালের বৃষ্টির জল গাছটির চারপাশের মাটি ধুয়ে নিয়ে গেছে। শুধু গোঁড়ার মাটি আগলে রেখেছে শেকড়গুলি। বাইনে-বাইনে শেকড়গুলি উপরে ওঠে গেছে, মাচার মতো। ঠাম্মা প্রায়ই তপ্ত দুপুরে নাতি নিয়ে গাছটির তলায় বসেন। নাতির মুখ দেখে, স্বামীর সঙ্গে কাটানো দিনগুলো অবলোকন করেন।
নিদান ঠাম্মার কাছে, মৃত স্বামীর পুনর্জন্ম! স্বামী মারা যাওয়ার নাকি এক বছরের মাথায় নিদানের জন্ম। এই বিশ্বাস ভরে দিয়েছেন, তাঁর পাশের বাড়ির দূর সম্পর্কের বড়-জা গোলাইস দিদি। আট বছর বয়েসে যখন বিয়ে হয়ে এসেছিলেন এই বাড়িতে। তখন বড় বোনের মতো পেয়েছিলেন গোলাইস দিদিকে। পাশাপাশি থেকে নিবিড় সম্পর্কের ডোরে বেড়ে উঠেছিল দুটো সংসারের ভিত।  আজও চলছে অবাদে দুজনের সুখদুঃখের বিনিময়। বর্তমানে দুজনের বেশিরভাগ আলোচনা, অচীনপুরে যাওয়ার 'টিকিট' নিয়ে।
ঠাম্মার সঙ্গে নিদানও বসে আছে, শেকড়ের তৈরি মাচায়। বয়োজ্যেষ্ঠ গোলাইস দিদি, আজ লিচু গাছের শীতল ছায়া মাড়াতেই!  হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন
- অলা গরমর মাঝে, মানুষ ইতা কিলা বাঁচতা!
- দেশঅ, পাপে ভরি গেছে গো গোলাইসদি! ঠাকুর বেটায় আর কিলা জারতা।
- আমার চিঠি-ইখান আর আইত নায় রে শান্তি!
- আইবো গো গুলাইসদি আইবো।
- তুইন গো ভইন, ইকথা ত কইবে! বেটা মরি গেলেও ত,  তর  কাছে নাতি অইয়া আবার আইছে। ঠিক তখন ঠাম্মা চেয়ে দেখলেন, নিদান মাচায় নেই। ভাবলেন আশেপাশে কোথাও খেলতে গেছে।
দু-জা মনের সুখে বিড়ি টানছেন। বিড়ির আগুন বৃদ্ধা তর্জনীর ভেতর পৃষ্ঠে লুকিয়ে।  আর, আগে পরে কে যাবে! তা নিয়ে আলোচনা করছেন। ঠাম্মার মরণের কথা প্রায়ই গোলাইস দিদি বলেন বলে, নিদানের চক্ষুশুল তিনি। সুযোগ পেলেই গোঁজা বুড়িকে হেস্তনেস্ত করে নিদান। আজ দুজনের অলক্ষ্যে, গাছের ডালে পাতার আড়াল হয়ে সব শুনছে। বদলা নিতে, শুশু... করে দিল কোমর বাঁকা গোলাইস ঠাম্মার পিঠে।
ঝরঝর জলের ধারা দেখে, ঠাম্মা হাসতে হাসতে বড়-জা-র উদ্দেশে বললেন
- গোলাইসদি অউ মনেকয় হাগো থাকি বারি বরিষণ অর। তোমার আর বেশি বাকি নায়, শেষ চিঠি আই-যাইবো।
গোলাইস দিদির নাকে একটি বিদঘুটে চেংড়া গন্ধ ভাসছে। ভাসারই কথা! দশ বছরের ছেলের পেচ্ছাবে বুড়ির উদোম পিঠ সিক্ত। রাগে বললেন
- না বেটি শান্তি! স্বর্গর বরিষণ অইলে হরুতার মুতর গন্ধ আইত কেনে?
উপরে চেয়ে দেখলেন, স্বর্গের 'মানস-বর' গাছের ডালে! লাঠি তুলে তেড়ে দাঁড়ালেন গোলাইস ঠাম্মা.....।
হাল ছেড়ে এসে, দাওয়ায় বসে, তন্দ্রাছন্ন ভাব কাটাচ্ছেন নিদানের 'বাপ'। জেঠির আর মায়ের কথা শুনে ছেলেকে শাসন করতে তেড়ে গেলেন। অমনি ঠাম্মা জোরালো গলায় আঙুল দেখিয়ে বললেন
- খবরদার! নাতির গাঁত হাত তুললে.....।
বাবা হাত নামিয়ে নিলেন। আর ডালে ছেলের দিকে তাকাতেই দেখলেন, গাছে এবার ফুল এসেছে। আপ্লুত হয়ে মাকে বললেন
- মা, বাবার গাছে 'বৌল' এসেছে......

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ