সাহানা - মঞ্জরী হীরামণি রায়

লিখেছেন  মঞ্জরী হীরামণি রায়

বৃষ্টি হয়েই চলেছে। দীর্ঘস্নান নিচ্ছে গাছেরা।মলিনতা ধুয়ে গিয়ে চার দিক কেমন ঝক ঝক করছে। পেছনের ব্যালকোনিতে দাঁড়িয়ে প্রাণ ভরে শ্বাস নিল  সায়েরি।এ শহরে এটা তার প্রথম বৃষ্টি।মাস খানেক হল মৈনাকের এখানে পোস্টিং হয়েছে। বরাকের পাশেই কোয়ার্টার।
ব্যালকোনি ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে কৃষ্ণচূড়া। এরই ফাঁক দিয়ে নদীর বহে যাওয়া দেখে সায়েরি।পাহাড়ি শহরে বড় হয়েছে সে। সেখানকার নদীর সাথে এই সমতল শহরের নদীর অনেক তফাৎ।নিজের শহরের বৃষ্টির সাথেও বিস্তর ফারাক।এই বাদল দিনে পাইন গাছ গুলোকে খুব মিস্ করছে ও।তবে কৃষ্ণচূড়ার ঝিরি ঝিরি পাতা থেকে  চুইয়ে পড়া রূপালী বৃষ্টি, লাল ফুলের গায়ে বৃষ্টি বিন্দু...  এসবের সাথেও ধীরে ধীরে ভালো লাগা তৈরি হচ্ছে। মনটা উচাটন হয়।বেরিয়ে পড়লে মন্দ হয়না। কিন্তু এ তো তার চেনা শহর নয়।একা বেরোনো ঠিক হবেনা।ফোন লাগায় মৈনাককে।    
               --এখুনি বেরোবে!! কী পাগলামো!
               --হ্যাঁ, পাগলামো। তুমি অফিস ম্যানেজ করে এসো মৈনাক।আমার একদম ঘরে মন টিকছেনা।
               -- সত্যি তুমি পাগল। চারদিকে জমা জল। এসময় কেউ বের হয়?


এসব কী! ড্রেন উপছানো জল আর নাগরিক যাপনের পুটলা পুটলির অথৈ যাত্রা।রাস্তার পাশের স্কুল কলেজ গুলোতে শরনার্থীর ঢল।মানুষের এত কষ্ট! আর  সায়েরি কিনা বৃষ্টি এনজয় করতে বেরিয়েছে।  মন খারাপ হয়ে যায়।
                 -- ঘরে চল মৈনাক।
            -- কেন? আমাকে অফিস ছুটি করালে,আর এখন বলছ 'ঘরে চল '! এটি হবে না ম্যাডাম! অফিসে মিথ্যে বলে বেরিয়েছি যখন এর লাভ তো উঠাতেই হবে!
সায়েরি কোনও উত্তর করেনা । চুপ চাপ বসে থাকে মৈনাকের পাশে।নিজের শহরের কথা মনে পড়ে।রাস্তা  গড়িয়ে বৃষ্টির জলের ছুটে চলা।এখানে ওখানে পাহাড়ের গায়ে ছোট বড় ঝর্না।ভিজে মরশুমি ফুল !সায়েরি ইচ্ছে করে ছাতা গুছিয়ে রেখে ভিজত।চোখ বুজে  ফেলে ও।দুচোখ গড়িয়ে জল পড়তে থাকে। মৈনাক খেয়াল করে ব্যাপারটা।নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয় ওর।সায়েরি খুব সেন্সেটিভ। কোথাও ওর খুব কষ্ট হচ্ছে।স্টিয়ারিং থেকে বা হাতটা নামিয়ে সায়েরির হাতে হাত রাখে।
              --কিসে এত কষ্ট পাচ্ছ সায়েরি? আমাকে বলতে পার।আমি হয়ত কিছু হেল্প করতে পারি।

  সায়েরি নীরবই থাকে। ওর দ্বারা এখন কথা বলা অসম্ভব।মৈনাক জোর করেনা।বুঝতে পারে কোথাও খুব কষ্ট হচ্ছে।বছর পুরো হয়নি ওদের যৌথ জীবনের।তবে এরই মধ্যে মৈনাক বুঝতে পেরেছে সায়েরি একেবারেই অন্যরকমের মেয়ে।এ মুহুর্তে ওর কফি খেতে যে একটুও ভালো লাগবেনা,মৈনাক এটুক বুঝতে পারে।গাড়ি ঘোরায় ও।
         নদীর বাঁধের উপর বিটুমিনের কালো রাস্তা। বৃষ্টির জল পেয়ে কালো চিক চিকে। দুপাশে জারুল,  অমলতাস। পাড় ছুঁই ছুঁই বরাক।গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছিল। সায়েরি মনটাকে ডাইভার্ড করতে চাইছিল কিন্তু পারছিল কই। বার বার মনটা উদাস হয়ে যাচ্ছিল। বৃষ্টির ছাট কমে এসছে। মৈনাককে এসি বন্ধ করতে বলে সায়েরি গাড়ির কাঁচ নামায়। কোথা থেকে যেন বাঁশীর সুর কানে লাগে। কান খাড়া করে ও। সুরটা চিনতে চেষ্টা করে। কী অপরূপ সুর!সাহানা রাগ! সায়েরির খুব প্রিয়।বাঁশুরিয়া তান করছে। আকাশের মেঘ কেটে অনেকটাই পরিস্কার।পশ্চিম আকাশে সূর্য আর মেঘের লুকুচুরি চলছে। সাথে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। মৈনাককে গাড়ি পার্ক করতে বলে সায়েরি। সামনেই নদীর ঘাট। পারাপারের জন্য নৌকো,  লঞ্চ দাঁড়িয়ে। একপাশে ছোট্ট ভিড়। সুরটা ওখান থেকেই আসছে। পায়ে পায়ে এগোয় সায়েরি। অদ্ভূত সেই সুর সাধক। গায়ে নোঙরা জামা কাপড়। মাথায় জট। অথচ সৃষ্টি করে চলেছে অসাধারণ সব সুরের মুর্ছনা। কেমন যেন ঘোর লাগে সায়েরির। বাঁশুরিয়ার পাশে বসে পড়ে ও। মৈনাক দূর থেকে দেখছিল। সায়েরির যে এটা নিছক পাগলামো নয় মৈনাক জানে। কারণ সেতার নিয়ে যখন সায়েরি সুর সাধে এমনি তন্ময় হয়ে যায়।এই তন্ময়তাকেই তো ও ভালোবেসেছে! ওদিকে বাঁশুরিয়ার তান দ্বিগুণ থেকে চৌগুণ।


         আজকাল সেতার আর বাঁশরীর যুগলবন্দীতে ঘুম ভাঙে মৈনাকের। নাহ্,  তথাকথিত পুরুষোচিত আচরণে বিশ্বাসী নয় মৈনাক। কিন্তু  সুরের কাছে এভাবে হেরে যেতেও পারেনা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ