পিতৃপরিচয় - দিব্যেন্দু নাথ

লিখেছেন  দিব্যেন্দু নাথ

 'পৌঁছে দাও মেজদার কাছে। বলো নিশিথকে কোনোভাবেই যেন ছাড় দেওয়া না হয়। তার 'গল্প' লেখার সাধ, জন্মের মতো মিটে যাক। কি ভেবেছে সে?  শিয়াল পণ্ডিত! পারলে একদম মাটিরসঙ্গে মিশিয়ে দিতে বলবে। নিশিথের আর বেঁচে থাকার প্রয়োজন নেই। মোবাইলটা শাট্ ডাউনের জন্য প্রস্তুত, বৌদি'। বলেতে না বলতেই সুইচ অফ হয়ে গেল। যাকে ভুলতে মরিয়া চেষ্টা করে তিতলি, কেন তার কথা বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়। বিপন্নতায় লেপ্টে গেল মুখখানি। বারবার হেরে যাচ্ছে নিজের কাছে। ক্ষিপ্র মনে ভাবে,  'এই সমস্যা তোমাদের! আমাকে কেন....। তোমাদের কথাই তো দাঁতভাঙা মন্ত্র উচ্চারণ করে দাসী হলাম অপরিচিত পুরুষের। তার ঔরসজাত সন্তান সম্ভবা এখন আমি। এই মূহুর্তে  গৌতম যদি জানতে পারে, নিশিথের ব্যাপার'....। তোমরা যদি আমাকে কেড়ে, তাকে শূন্য না করতে! বই লেখার, প্রেরণা কোথায় পেতো। শূন্যতা ছাড়া কি মানুষ কবি-সাহিত্য হয়? এই সমস্যা তোমাদের তৈরি করা! তোমরাই এখন বুঝবে...।

পুঞ্জিভূত কথাগুলোর আভিমানে দম ধরে থাকে তিতলি। থরথরে লাফিয়ে উঠে বুকের বিগলিত পারদ। নিজের তিলে তিলে বড় হওয়া পেটের দিকেই তাকাতেই টুপ করে গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোটা না বলা ব্যথা। হঠাত্ বাড়ি কোণে, শেষ বেলায় শিমুল মাথায় নজর পড়ল। মুহূর্তে এক খণ্ড কালো মেঘ গিলে ফেলল আকাশটাকে। নেমে এল বৃষ্টি, সঙ্গে ঝড়ো-বাতাস।

ঝড়ঝঞ্ঝাটে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন বাড়ি। তিতলির মনের আকাশ, হারানো ছাপে আচ্ছন্ন। ভাবছে - একখানা পুস্তক চাইব? নিশিথর কাছে!  যদি 'স্বামীর' নজরে আসে। এই সংসারে ত 'পান থেকে চুন খসলেই' তুমুল লড়াই। বই দেখে যদি আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে।

স্তব্ধ অন্ধকারে ডুব দিয়েছে পৃথিবীর এই অংশ। পাখিদের গলা শুকিয়ে অস্ফূট আর্তনাদ। বারবার অধরা স্মৃতিগুলি কেঁপে উঠে তার বেহায়া মনে।

আমার ছদ্মনামে কিছু লিখবে নিশিথ। আগেই ত জানান দিয়ে রেখেছিল। উদ্বিগ্নতা আরো বেড়ে গেল তিতলির। তবুও নিশিথর প্রকাশিত বই পাওয়ার আশায়, সোনালি ঝিলিক পরিস্ফুটিত করে তুলল। জীবনের ফেলে আসা বাঁকগুলো। অনেক দিনের জং ধরা হৃদয়, আবারও বিচ্ছুরিত হতে চলেছে...। মাটির  দেওয়ালে এঁকে যাচ্ছে কত বিষাদিত প্রতিবিম্ব।

বৃষ্টি স্নাত সন্ধ্যায় দ্বাদশীর একফালি চাঁদ আকাশে। তাকে ধরতে মেঘেরা কৌতূকে ছুটাছুটি করছে। লুকোচুরি খেলায় মত্ত আধখানা চাঁদ নিয়ে, তিতলি একাই বাড়িতে। ধুসর ছবিগুলো ভাসছে চোখে...। দুষ্টু নিশিথের সঙ্গে কীভাবে তার মিষ্টি শৈশব কাটিয়ে ছিল।

দেখতে পাচ্ছে, আভিজাত্য বাঁচাতে দাদা, ছলনাকে অস্ত্র করে, বংশের মিথ্যে অহমিকায়, কীভাবে মগজ ধোলাই করেছে তার। নিশিথকে জীবন থেকে সরাতে, দাদা আলোআঁধারি খেলায় মেতে উঠেছিল তখন। তিতলির সফল হওয়া অনুভূতিগুলো, কীভাবে দাদা বিচ্ছিন্ন করে, বিপথে ঠেলে দিল। আলেয়ার মতো সবকটি ছবি, বেন্টিলেটারের ফাঁক দিয়ে এসে, মুখ ভ্যাঙচিয়ে যাচ্ছে ঝলকে ঝলকে।

অভিসন্ধিতে ভরা ছিল তার শৈশব, কৈশোর। যেখানে চাইলেও ফিরে গিয়ে শোধরাতে পারবে না সে। তার প্রত্যাখ্যানে, নিশিথ হয়েছিল, ভবঘুরের এক অচিন মানুষ। লুকিয়ে লুকিয়ে কত প্রার্থনা করেছে তিতলি। মন্দিরে মন্দিরে। তার ফসল, বর্তমানের খানিকটা সুস্থ নিশিথ। যাপিত শৈশব, কৈশোরের কয়েকটি ধারা মাত্র তুলে ধরেছে সমাজের আয়নায়। -তাতে তোমাদের এত জ্বালা! নিশ্চিত, নিশিথের এই আয়নায় তোমরা, নিজেদের কুৎসিত চেহারাটা দেখে ভয় পেয়েছ। আগের মতো আবার আমাকে টানছ তোমাদের দলে। তাকে হেস্তনেস্ত করতে। আমি হয়তো তোমাদের বিরোধীতা করার সাহস দেখাবো না। তবে, তোমাদের সঙ্গও দেবো না। বর্তমানে নিশিথ! তোমাদের ধরাছোঁয়ার কয়েক যোজন উপরে।

হঠাত্ একটি বিকট আওয়াজে চমক ভাঙল। আন্দাজ করল, বাড়ির দখিনে বাজ পড়েছে। কিন্তু আকাশে ত কোনো ঝলকানি ছিল না! ধড়মড়িয়ে উঠল তিতলি। সাঁঝবেলার আগে গৌতম গিয়েছিল বাজার আনতে। অন্ধকারে বেরোনোর সাহস নেই তিতলির। - 'না-আ। ক্ষণিকের মধ্যে অস্পষ্ট পৌরুষালী কণ্ঠস্বর। এমনিতেই সন্দিহান ছিল, - স্বামী তো দুধেধুয়া তুলসী পাতা নয়।

এই মুহূর্তে দরজায় কেউ তোতলিয়ে, তিতলি তিতলি বলে কড়া নাড়লো। দরজা খুলে দেখল, খালি-ব্যাগে মাতাল স্বামী।
আজও আবার রান্না-বান্না হল না ঘরে। দুজনেই অভুক্ত রইল। স্বামী উল্টো দিকে মাথা রেখে বিছানায় বেহুঁশ। তিতলি অনেক বার চেষ্টা করেও পারল না সোজা করতে। অবশেষে নিজের কপালে, আঙুল বেঁকে জোরে জোরে ঠুকল। তারপর স্বামীর জুতো খুলে, পা খাটে রেখে, মাশারি নামিয়ে দিল।


কুপির আলোয় শিষ ছড়ানো গভীর রাত। মাটিতে বস্তা পেতে মেঘলা মনে তিতলি।  বন্ধ চোখ, হাঁটুর উপর মাথা কাত করে বসে রইল - অনেকক্ষণ। হঠাৎ রোমহর্ষক কিছু শব্দকুহক!!

আওয়াজটা, ভয়াবহ ভুতুড়ে। নিস্তব্ধতা ভেদ করে ফুটল ভয়ার্ত শস্যফুল। একটা  শীত-শীত ভাব অনুভূত হল তিতলির।
'কে জানে! কেমন রুচির মানুষ হলে, এমন বিদঘুটে আওয়াজ পছন্দ করে মোবাইল রিং-টোনে। নেশার বেগুড় স্বামী। এ জগতের কেউ নয়। মেজদার নাম্বার আবার দেখে, ফোনটা রিসিভ করল তিতলি। এবার বৌদি নয়, মেজদার গলা,
- 'গৌতমকে নিয়ে কাল আসবে আমাদের ওখানে'। রাত কাটল দু মনা হয়ে। সমাজে এখন তার একটা, আলাদা মর্যাদা আছে, কারো স্ত্রী বলে। -হোক না স্বামী মাতাল।

কখন যে কীভাবে নিজের শরীর এলিয়ে দিয়েছিল স্বামীর পায়ের কাছে, বুঝতে পারেনি। অ্যলকোহলের অত্যাচারে বেহুঁশ স্বামীর আবোলতাবোল গোঙানি। তন্দ্রা ভেঙে গেল তিতলির।

গভীর রাতে দৃষ্টির সঙ্গে মনকেও আঁধার দিয়ে বাঁধতে চাইছে বারবার। কেন জানি , ছিঁড়ে যাচ্ছে বাঁধন।

দাদা নিশ্চয়ই ডেকেছে, আমাকে দিয়ে
নিশিথের গল্পের 'সত্যমিথ্যে' যাচাই করবে। কিন্তু কিছুতেই আমি তা, সত্য বলে স্বীকার করব না।

আমার গা বেয়ে যে নতুন অতিথি আসছে। তার সামাজিক মর্যাদা রাখতে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পিতার পরিচয় খুবই প্রয়োজন। দাদার আভিজাত্য বাঁচাতে আমি আর, সন্তানের ক্ষতি করব না...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ