শন-পাখি - দিব্যেন্দু নাথ

লিখেছেন  দিব্যেন্দু নাথ

মটর স্ট্যান্ডের বট তলার মাচায় গায়ের কাপড় রেখে গামছা প্যাঁচিয়ে দা হাতে ছুটছে মদন। সারিবদ্ধ গাড়িগুলি পেরিয়ে  পূর্বপ্রান্তের বাউন্ডারি টপকালো। উরিছড়া নদীর ছোট্ট বাঁক। 'যজ্ঞডেঙ্গুরা' গাছ। দু মাস আগে এসেছিল সন্তান প্রসবা 'শন-পাখি' দম্পতি। মা এখানেই দুটো সন্তান জন্ম দিয়েছে। মাতৃস্নেহে তিন মাস কাটিয়ে, এখন ওরা টগবগিয়ে প্রকৃতির খেলা অবলোকন করতে পারে। নীচে বয়ে যাওয়া স্রোতস্বিনীর ঢেউএ ওরা কিছিরমিছির তাল দেয়। ঢেউ ছুটছে পশ্চিম অভিমুখে। বটতলা ঘেষে  'দেও' এর খুঁজে। এক পাশে 'শান্তি মেনসন ইনস্টিটিউট' আরেক পাশে কাঞ্চনপুর মহকুমা হাসপাতাল রেখে। 
ঝোপের নীচের ডালে সদ্য এসেছে। রাণীসহ দলবল নিয়ে এক রাজ পরিবার।
ছেলেধরা মদন বাচ্চাদুটো বন্দী করতে সক্ষম হয়েছিল। মা উড়ে গিয়ে সন্তান বাঁচানো আর্তি জানায় রাণীকে।

রাজ পরিবারের সৈন্যের আক্রমণে প্রাণ বাঁচতে মদন ঝাঁপ দেয় নদীর জলে।
বর্ষার মান্ধাতায় সব গাড়ির চালক তীর্থের কাক হয়ে বসে আছে মাচায়।
তাদের অলস সময় কাটে, আড্ডা-ইয়ার্কীর রঙে।
বিষাক্ত আঘাতে, অর্ধ-চৈতন্য মদনের দেহ ভেসে যাচ্ছে স্রোতের অনুকুলে। তখনও লালসা ভরা মুঠোয় অবুঝ শিশু দুটি।
সহকর্মীদের নজর পড়ে, ক্রমে নীল হয়ে যাচ্ছে মদন। টানাটানি করে তুলা হয় তাকে ডাংগায়। তারপর হাসপাতালে।
ঝাঁকা নামক কালকুঠুরিতে বন্দী করে রাখা হয় শিশু দুটিকে। মায়ের আর্তনাদে আকাশ উত্থলে উঠেছে। যেন স্ট্যান্ড চত্বর বিষাদ-কালো মেঘে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে....।
আরেক মায়ের আর্তনাদ শোনা গেল হাসপাতাল চত্বরে। মদনকে নেওয়ার মিনিট দশেক আগে বড় ছেলে সুমনকে নিয়ে এসেছেন মা। মায়ের সামনে রক্তাক্ত করা হয়েছে ছেলেকে। প্রভাবশালী রাজ নেতার অনুচরের আক্রমনে। তার ভুল!  নেতার অবৈধ্য ব্যবসার গোপন তথ্য সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেছে। শরীরের রক্ত জমাট বেঁধে আরেক শরীর তৈরি করার বেদনা, এক মা-ই জানে! বর্তমানে দু ভাইয়েরই চিকিত্সা চলছে হাসপাতালে, মায়ের আঁচল তলে ....।
শিশু দুটোর শিরচ্ছেদ করে, ভোজ্য বস্তুতে রূপান্তরিত করতে শুরু হল দা নামক অস্ত্রের অন্বেসণ। জলের অতলে অনেক খোঁজাখুজি পর,  মদনের দা দেখা গেল 'যজ্ঞডেঙ্গুরা' গাছের ডালে কোপ দিয়ে বসানো। চারপাশে রাজসৈন্য। এখানেও মায়ের আর্তনাদ, কাল-কুঠুরিতে অসহায় সন্তানদের পানে চেয়ে....

(1 যজ্ঞডেঙ্গুরা - ত্রিপুরা লব্ধ গাছের আঞ্চলিক নাম।
2 শন-পাখি - বন ঘুঘু প্রজাতির একটি কালসে গেরুয়া রঙের পাখির আঞ্চলিক নাম। ওরা খুব মানুষ ঘেঁষা পাখি।)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ